বাজেটের এক-অষ্টমাংশ যাবে অনুৎপাদনশীল খাতে, দাবি গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অনুৎপাদনশীল হিসেবে চিহ্নিত আটটি খাতে এক লাখ ২৩ হাজার ৩৯৩ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হবে বলে দাবি করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। সংগঠনটির মতে, মোট বাজেটের প্রায় এক-অষ্টমাংশ এসব খাতে ব্যয় করা হচ্ছে, যা উন্নয়ন ও জনসেবামুখী ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনা: উন্নয়ন দর্শন ও কাঠামোগত সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় উপস্থাপিত এক প্রবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সভার আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। এতে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

প্রবন্ধে বলা হয়, যেসব খাতে ব্যয়কে অনুৎপাদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ, জ্বালানি তেল ও তৈলাক্তকরণ সামগ্রী, ভ্রমণ ও বদলি, মুদ্রণ ও দাপ্তরিক সামগ্রী, পেশাগত সেবা ও সম্মানী, মেরামত ও সংরক্ষণ, ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ এবং আইনশৃঙ্খলা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়।

সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে আরও বলা হয়, গত ১৮ বছরে জনপ্রশাসন খাতের বাজেট ২৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের মোট বাজেটের ২৮ শতাংশ ব্যয় হবে জনপ্রশাসন খাতে। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রকৃত বাজেটের তুলনায় এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে যে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়েছে, তার ৫১ শতাংশই জনপ্রশাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে শিক্ষা খাতে ১৭ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ১২ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারের ৬১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাত্র দুটি মন্ত্রণালয় তাদের ব্যয়ের বিস্তারিত হালনাগাদ তথ্য নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, সুপ্রিম কোর্ট, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কোনো বিস্তারিত বাজেট তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে উন্নয়নের নামে যে ব্যয় করা হচ্ছে, তার বড় অংশই কেনাকাটা ও দৃশ্যমান অবকাঠামোকেন্দ্রিক। অথচ জনসেবার মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও শিক্ষক নেই, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বহু চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে চিকিৎসক ও নার্সের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকলেও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব যন্ত্রের অনেকগুলোই দীর্ঘ সময় ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকে।

আনু মুহাম্মদের মতে, প্রকৃত উন্নয়ন শুধু ভবন নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দক্ষ জনবল নিয়োগ, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং জনগণের জন্য মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হারুন অর রশীদ, অধ্যাপক গোলাম রসুল, মোশাহিদা সুলতানা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান।