দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী নতুন এক পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শরীরে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, নদীতে ক্রমবর্ধমান দূষণের ফলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘হালদা নদীর মাছের মধ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দূষণ: বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, হালদা নদী থেকে সংগ্রহ করা আট প্রজাতির ৪৮টি মাছের প্রতিটির শরীরেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষিত মাছের শতভাগই এ দূষণের শিকার।
গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ৬ দশমিক ৫টি এবং মাংসপেশিতে গড়ে ৬টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, প্লাস্টিক কণা শুধু মাছের পাকস্থলীতেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত অংশেও প্রবেশ করছে।
সবচেয়ে বেশি দূষণ শনাক্ত হয়েছে শিলন মাছে। এ মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ১০ দশমিক ৮টি এবং মাংসপেশিতে ৮ দশমিক ২টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এছাড়া পানির উপরিভাগ ও তলদেশ উভয় স্তরে বিচরণকারী মাছের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকেরা তন্তু, পাতলা স্তর, ভাঙা টুকরা, ফেনা এবং দানাদার—এই পাঁচ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে তন্তুজাত কণার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। মাছের মাংসে পাওয়া কণার ৮০ শতাংশেরও বেশি ছিল ৫০০ মাইক্রোমিটারের কম আকারের।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিপ্রোপিলিন, পলিথিলিন, পলিয়েস্টার এবং পিইটিই ধরনের প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়ক, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং বস্ত্রশিল্পের বর্জ্য এ দূষণের প্রধান উৎস।
গবেষক দলের সদস্য ও হালদা গবেষণা পরীক্ষাগারের সমন্বয়ক মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, নদীতে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হালদার জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক নদী-প্রতিবেশের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ১৯টি খালের মাধ্যমে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাজার এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে খন্দকিয়া, কৃষ্ণখালী, কাটাখালী, মাদারী এবং বোয়ালিয়া খালকে দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি খন্দকিয়া খালে। এই খালের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি হালদা নদীতে গিয়ে মিশছে। বিভিন্ন স্থানে পানির স্বাভাবিক রং পরিবর্তিত হয়ে কালচে ও ঘোলা হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানির ওপর ভাসমান প্লাস্টিক বর্জ্য এবং তেলের মতো আস্তরণও দেখা যাচ্ছে।
হালদা নদীর তীরবর্তী এলাকার প্রবীণ মৎস্যজীবী মো. কামাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি নদীর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছেন। তার ভাষায়, আগের মতো নদীর পানি আর স্বচ্ছ নেই। প্রায়ই ডলফিন ও মা মাছের মৃতদেহ ভেসে উঠতে দেখা যায়। চোখের সামনেই নদীর পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, অপরিশোধিত শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে হালদা নদী ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। নদী রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। হালদা নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপন্ন হালদা নদী প্রায় ৯৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীতে মিলিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত এ নদীর জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকেরা।
