সংসদে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, স্পিকারের হস্তক্ষেপ

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, সরকারি দলের সদস্য এবং চিফ হুইপ। পরে স্পিকার বিষয়টিকে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে বিতর্কের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান।

বুধবার সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, এবারের বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়নি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও তেমন কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

বাজেটের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, মানুষের জীবনে প্রাপ্ত অনুগ্রহ ও সুযোগ-সুবিধার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি আরেকটি আয়াত উল্লেখ করে বলেন, মানুষের সব কৌশলের ঊর্ধ্বে আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম।

তার বক্তব্যের পর পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, কোরআন ও হাদিসের বাণী অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয়, এগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি দাবি করেন, আলোচনায় উদ্ধৃত আয়াতের ব্যাখ্যা মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্যুত হয়েছে। কোরআনের আয়াত রাজনৈতিক বক্তব্যের সমর্থনে ব্যবহার করা হলে তা বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে এক বৈঠকের স্মৃতিচারণ করে কোরআনের আয়াত ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

আপত্তির জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং তার বক্তব্যে কোরআন-হাদিসকে ব্যঙ্গ করার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি মনে করেন না। তবে কোনো আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ে থাকলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি এবং তিনি কোনোভাবেই কোরআনের অবমাননা বা ভুল উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেননি। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল মানুষের জীবনে আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব তুলে ধরা।

তিনি বলেন, কোনো বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। সংসদে ইসলাম বা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অবমাননাকর কোনো মন্তব্য হলে সবাই তা নিন্দা করবে।

এ সময় স্পিকার সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, ধর্মীয় বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ ধরনের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়।

পরবর্তীতে রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বক্তব্য দিয়ে বলেন, আলোচিত আয়াতের মূল প্রেক্ষাপট আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি দাবি করেন, বাজেটের প্রশংসা না করলে শাস্তি হবে, এমন ব্যাখ্যা আয়াতটির মূল বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এরপর সরকারি দলের সদস্য মো. কামরুজ্জামান বলেন, কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী সঠিক বিষয় গ্রহণ ও তা অনুসরণ করাই সবার দায়িত্ব। তিনি আলেম-ওলামাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ধর্মীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।

সবশেষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, আলোচিত সংসদ সদস্য একজন আলেম এবং তিনি কোনো ব্যঙ্গ বা পরিহাসের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেননি। বরং ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে মানুষের আমল ও আচরণ আরও শুদ্ধ করার লক্ষ্যেই তিনি বক্তব্য রেখেছেন।

তিনি বিষয়টি নিয়ে আর আলোচনা না বাড়িয়ে সংসদকে অন্যান্য কার্যক্রমে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান। পরে স্পিকারের নির্দেশনায় এ বিষয়ে বিতর্কের সমাপ্তি ঘটে।