তিস্তা প্রকল্প, নদী ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ-চীনের ১৩ সমঝোতা স্মারক

বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে উন্নীত করতে ১৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতাবিষয়ক ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

এর আগে একই স্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করা হয়।

তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা জোরদার

সফরের অংশ হিসেবে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য চলমান নদী খনন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন। তিনি তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পসহ দেশের নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের কারিগরি সহায়তা কামনা করেন।

আলোচনায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদী খনন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে ঐকমত্য হয়। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী এ খাতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য চীনে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ চীনা উদ্যোক্তাদের

বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিশেষ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে চীনের প্রায় ৮০ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি নতুন শিল্প লাইসেন্স ১৫ দিনেরও কম সময়ে প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় আস্থা রেখে চীনের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকেই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ আগ্রহ পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

দলীয় পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ

দিয়াওইউতাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

চীনা প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

সীমিত প্রতিনিধিদল নিয়ে সফর

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে এবং ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে সীমিত প্রতিনিধিদল নিয়ে অংশ নিয়েছেন।

তিনি বলেন, সফরসঙ্গী হিসেবে মোট ২৫ জন রয়েছেন, যাদের মধ্যে মন্ত্রী ও উপদেষ্টা পর্যায়ের ১১ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই এই সফর পরিচালিত হচ্ছে।

আজ শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক

সফরের শেষ দিনে আজ শুক্রবার (২৬ জুন) চীনের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।

রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শেষে আজই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।