ঢাকা: দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের পথে এক ধাপ এগোলো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এমপিওভুক্তির বিষয়টি। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ জন্য নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেই এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বলে স্পষ্ট করেছেন মন্ত্রী।
মঙ্গলবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ফাজিল ও কামিল স্তরের ‘শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও অনন্য শিক্ষার্থী অ্যাওয়ার্ড প্রদান’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এমপিওভুক্তি নিয়ে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করবে। এ বিষয়ে আগে থেকে নীতিমালা রয়েছে এবং সেই নীতিমালার শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এমপিওভুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি আগে গুছিয়ে নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠান যোগ্য, তা যাচাই করা হবে। এরপর বাজেটে বরাদ্দ রাখা অর্থ থেকেই এমপিও সুবিধা দেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যেই সম্পন্ন হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এমপিও দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, কোনো বিষয়ে নিয়ম-কানুন ও নীতিমালা থাকলে সেটির বাইরে গিয়ে দাবি আদায়ের প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে নিয়ম মেনেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই অনুসরণ করা হয়নি। আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং অন্যান্য শর্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড শিথিল করা হয়েছে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যথাযথ পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই অনুমোদনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অতীতের নানা অনিয়মের কারণে বর্তমান সরকারকে জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে এসব নিয়ে শুধু সমালোচনা না করে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান বের করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান। তার ভাষায়, ইসলামি শিক্ষাকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিকতা, দক্ষতা এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে হবে। সময়োপযোগী পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক এবং গবেষণানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব নয়।
মন্ত্রী আরও বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সংখ্যা ১ হাজার ৫১৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মাসে ৫ হাজার টাকা এবং সহকারী শিক্ষকরা ৩ হাজার টাকা করে অনুদান পান। এছাড়া আরও ৫ হাজার ৯৩২টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলো সরকারি কোনো অনুদানের আওতায় নেই।
উল্লেখ্য, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর ২০২৫ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যায়ক্রমে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত এবং পরবর্তীতে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়। একই বছরের ২৫ জুন এমপিওভুক্তির নীতিমালা জারি করা হয় এবং ৮ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীতে গত বছরের ৩ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে ১ হাজার ৮৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত করার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও অনশন পালন করেন শিক্ষকরা।
‘স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক কল্যাণ কমিটি’র সদস্য সচিব আব্দুল হান্নান হোসেন জানান, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আগামী অর্থবছর থেকে এমপিওভুক্তির আশ্বাস পাওয়ায় তারা আন্দোলন স্থগিত করেছেন। তার ভাষ্য, ২০২৫ সালের নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করা ১ হাজার ৩২৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগ্য মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর খানের সভাপতিত্বে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ ইলিয়াছ ছিদ্দিকী এবং ট্রেজারার শাহীনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
