পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, ডিজিটাল হ্যাকিং, ভুয়া পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা, উত্তরপত্রে কারসাজিসহ প্রযুক্তিনির্ভর নানা অনিয়ম দমনে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। সংশোধিত আইনে নতুন ধরনের অপরাধের সংজ্ঞা যুক্ত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিনিরাপদ করতে জাতীয় সংসদে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। নতুন আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ডিজিটাল কারসাজি, অবৈধ পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা, উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনের বিভিন্ন ধারা যুগোপযোগী করা হয়েছে। সরকার বলছে, প্রায় চার দশক আগে প্রণীত আইনটি বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকর ছিল না। তাই ডিজিটাল জালিয়াতি ও সংঘবদ্ধ পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে প্রথমবারের মতো ‘ডিজিটাল কারসাজি’ শব্দটির আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় পাবলিক পরীক্ষার ডাটাবেজে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, হ্যাকিং, তথ্য পরিবর্তন, মুছে ফেলা, বিকৃত করা কিংবা গোপন করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল প্রতিরোধে পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে নিয়ে বা তা ব্যবহার করে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ কিংবা পরীক্ষা-সংক্রান্ত নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
নতুন আইনে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁসের শাস্তিও আরও কঠোর করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্র নিজের কাছে রাখা, প্রকাশ, প্রচার বা বিতরণ করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।
এছাড়া অনুমোদন ছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন বা পরিচালনা এবং জেনেশুনে এমন কর্মকাণ্ডে নিজের স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
উত্তরপত্র মূল্যায়নে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দিয়ে ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে প্রতিষ্ঠান বা সেবাদানকারী সংস্থার দায়বদ্ধতাও যুক্ত করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধে সহায়তা করলে অথবা কর্মীদের যথাযথ তদারকি করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিয়েছিলেন বা অপরাধ সম্পর্কে জানতেন না, তা প্রমাণ করতে পারলে দায়মুক্তি পাবেন।
অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বিচার পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সৎ উদ্দেশ্যে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য প্রকাশকারী তথ্যদাতাদের (হুইসেলব্লোয়ার) আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি, ফৌজদারি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া না যায়।
নতুন আইনে পরীক্ষা-সংক্রান্ত সব অপরাধকে আমলযোগ্য (কগনিজেবল) করা হয়েছে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে। মহানগর এলাকায় মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যান্য এলাকায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে এসব মামলার বিচার করবেন।
এছাড়া সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে সংশোধিত আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষা জালিয়াতি মোকাবিলা করে দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ন্যায়সংগত পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
