মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শুধুমাত্র প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার নিশ্চয়তা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের মামলাজট কমাতে বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগ বৃদ্ধি, পুরোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং তদন্ত কার্যক্রমে আরও জোরদার তদারকির কথা জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গুম, হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ পুনর্গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালেই বিচারিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে পলাতক আসামিদেরও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) রুলস অব প্রসিডিউর, ২০১০ অনুযায়ী বর্তমানে ১৭টি মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে সরকারি খরচে ৪৪ জন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন আইনের আওতায় জাতিসংঘসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিদের বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল শুনানি, ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে পলাতক আসামির সম্পদ জব্দের ক্ষমতাও ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে।
মামলাজট নিরসন প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পাঁচজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০১ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক নতুন বিচারপতি নিয়োগের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
অধস্তন আদালতের বিচারক সংকট দূর করতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। মন্ত্রী জানান, অনুমোদিত ২ হাজার ৬২০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১ হাজার ৯৬৪ জন বিচারক কর্মরত রয়েছেন। শূন্যপদ পূরণে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে, যার মাধ্যমে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া ১৯তম বিজেএসের মাধ্যমে আরও ১৫০ জন এবং ২০তম বিজেএসের মাধ্যমে ২০০ জন সিভিল জজ নিয়োগের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলাগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা আসামিদের মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কগনিজেন্স ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ, ফরেনসিক মতামত গ্রহণসহ তদন্তের প্রতিটি ধাপ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা এবং পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি সম্মেলনের মাধ্যমে বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
