জ্বালানি সংকটে চাপে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা, সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের জ্বালানি খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, ব্যবহার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) প্রকাশিত ইলেকট্রিসিটি মিড-ইয়ার আপডেট ২০২৬ প্রতিবেদনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এলএনজি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি তাদের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতকে প্রভাবিত করছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় বেশি ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের ব্যবহারেও।

অস্থির জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ

আইইএর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি বছরও বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মুখে থাকতে পারে। জ্বালানির উচ্চমূল্য শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা

একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্পায়ন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে আইইএ।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের চাহিদা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ। ফলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৩০ হাজার ৭০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে, যা ২০২৫ সালে ছিল ২৮ হাজার ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা।

বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়

আইইএ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পর এশিয়া ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০২২-২৩ সালের জ্বালানি সংকটের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাজারের চাপ কিছুটা কমাতে উত্তর আমেরিকা থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ করা হলেও তা পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেনি। বরং গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ পুনরায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আশার আলো

জ্বালানি সংকটের মধ্যেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সমপর্যায়ে পৌঁছানোর পর এবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কয়লাকে ছাড়িয়ে যাবে। চলতি বছর নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮ শতাংশের বেশি বাড়বে। এর ফলে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০২৫ সালের ৩৩ শতাংশ থেকে ২০২৭ সালে ৩৭ শতাংশে উন্নীত হবে।

সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটবে সৌরবিদ্যুৎ খাতে। আইইএর মতে, ২০২৬ সালে সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) উৎপাদন বায়ু বিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে জলবিদ্যুতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে। চলতি বছর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বৃদ্ধি পাবে, যা আগের বছরের রেকর্ড প্রবৃদ্ধির সমান।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে চলতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ থাকবে।

তবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো এলএনজি-নির্ভর দেশগুলোকে এখনও উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বহন করতে হবে। জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এসব দেশে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও শিল্প উৎপাদন চাপের মুখে থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইইএ।

জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন ঝুঁকি

আইইএ আরও উল্লেখ করেছে, জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তন জ্বালানি সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বছরের শেষ দিকে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে এবং বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে।

একই সময়ে কিছু অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে, ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কার্বন নিঃসরণ বাড়ার শঙ্কা

আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তবে ২০২৭ সালে তা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এলএনজি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বিদ্যুতের পাইকারি বাজারেও পড়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানে স্পট মার্কেটে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও ভারতে ১০ শতাংশের কম বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইইএর মতে, বড় অর্থনীতিগুলো বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।