পেঁয়াজ সংরক্ষণে আরও ১৫ হাজার মেশিন

দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে। এই ক্ষতি কমিয়ে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং ভবিষ্যতে পেঁয়াজ রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে কৃষক পর্যায়ে আরও ১৫ হাজার এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।

‘বাংলাদেশের পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব প্রশমনে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভিযোজন প্রকল্প’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

মন্ত্রী বলেন, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে সংগ্রহের পর নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই অপচয় কমিয়ে পেঁয়াজ আমদানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করাই সরকারের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ দেশের বাইরে বসবাস করেন। তারা দেশীয় পেঁয়াজই খেতে চান। বিশ্বের অনেক দেশের পেঁয়াজের তুলনায় আমাদের দেশীয় পেঁয়াজের স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মান আলাদা। তাই দেশীয় উৎপাদন সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে ১১ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ২০২৫ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।

প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী ১৬টি জেলার ১০৭টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে পবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মাগুরা, ঝিনাইদহ, মানিকগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রংপুর ও বগুড়া।

আয়োজকরা জানান, প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে সংগ্রহোত্তর পচন রোধে ৩ হাজার ৭০০টি পরিবেশবান্ধব এয়ার ফ্লো মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে। নতুন করে আরও ১৫ হাজার মেশিন বিতরণ করা হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা দীর্ঘ সময় পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৯০০ জন কৃষককে আধুনিক পেঁয়াজ সংরক্ষণ প্রযুক্তি, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি কৃষককে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মশালায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সচিব ড. মো. রফিকুল ই মোহামেদ। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের অগ্রগতি, পেঁয়াজ সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহফুজুর রহমান।

বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং সংরক্ষণ সুবিধার ঘাটতির কারণে পেঁয়াজ উৎপাদনের পর উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক এয়ার ফ্লো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংরক্ষণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জন করবে না, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশীয় পেঁয়াজ রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।