দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। ‘উচ্চশিক্ষা রূপান্তর ও টেকসই উৎকর্ষ অর্জনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ইউজিসি চেয়ারম্যানের সভাকক্ষে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এ কর্মপরিকল্পনার খসড়া নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।
সভায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ইউজিসির নেতৃত্বকে আরও কার্যকর, দক্ষ ও গতিশীল করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা খাতে যেসব সংস্কার সফল হয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বাস্তবতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে শুধু দেশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্যে পরিণত করতে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে চীন, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সফল অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতা, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখেই দীর্ঘমেয়াদি এ সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কর্মপরিকল্পনায় পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধি ও চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা জোরদার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার সম্প্রসারণ, শিক্ষক উন্নয়ন এবং গবেষণার উৎকর্ষ ও আন্তর্জাতিকীকরণ।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম-বেইজড এডুকেশন (ওবিই), ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) এবং ডিজিটাল প্রশাসন চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সেবাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
এছাড়া গবেষণার মানোন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গবেষণা প্রকাশনা ও পেটেন্টের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সভায় জানানো হয়, জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করার আগে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হবে। এসব মতামত ও সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
সভায় ইউজিসির সদস্যরা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
