নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাসের তীব্র সংকটের মধ্যেই মজুত নিয়েও বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে অগ্রগতি না থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরে সিপিডি।
অনুষ্ঠানে সিপিডির উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় ভিত্তি প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের ফলে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমছে এবং উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বিপরীতে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমেই বড় হচ্ছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। ওই দিন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ। সার কারখানাগুলো পেয়েছে তাদের প্রয়োজনের মাত্র ৩৮ শতাংশ। গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়।
এফএসআরইউ সংকটে সরবরাহ
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া কঠিন। আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই।
তিনি জানান, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি বিবেচনায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্ট এলাকায় এসব টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে কাজ চলছে।
মন্ত্রী বলেন, এফএসআরইউ মেরামতের কাজ বিদেশি প্রকৌশলীদের মাধ্যমে চলছে। টার্মিনালটি মেরামতের পর দুটি বয়লার সমন্বিতভাবে চালু করতে আরও প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হতে পারে। এ সময়ে গ্যাস সরবরাহে সাময়িকভাবে আরও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
নতুন এফএসআরইউ নির্মাণে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল এসব টার্মিনালে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের দ্রুত লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
শিল্পে উৎপাদন কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে পড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন কারখানায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমেছে। সংকটের খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা উচ্চ হারে বিল পরিশোধ করেও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়তে পারেন বলেও তিনি সতর্ক করেন। শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় গ্যাস সরবরাহে শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং জরুরি সুরক্ষা প্যাকেজ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এলএনজি আমদানি অব্যাহত
ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর কারণে এলএনজি আমদানি বন্ধ করা হয়নি বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে চারটি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে, যাতে টার্মিনাল প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো দেশে আনা যায়।
মন্ত্রী আরও জানান, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) দ্রুত খননকাজ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে আরও দুটি রিগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বাজার ব্যবস্থাপনা কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হবে বলে জানান তিনি।
২০৩০-এর দশকের শুরুতেই বড় সংকটের আশঙ্কা
সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুল আল কবির গ্যাসের চাহিদা, সরবরাহ ও মজুত নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের মোট ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে অবশিষ্ট মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান হারে ব্যবহার চলতে থাকলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই গ্যাসের মজুত সংকটজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিদ্যমান মজুত সংরক্ষণেও দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সিপিডির উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপরও উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। ফলে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত উভয়ই ঝুঁকিতে পড়ছে।
স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশ
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশ করেছে সিপিডি। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি ক্রয়ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, মূল্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মধ্য মেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ অবকাঠামো বাড়ানো, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনালের প্রস্তাব
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের বড় একটি অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে।
নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগতে পারে উল্লেখ করে দ্রুত সংকট মোকাবিলায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে। এসব জটিলতা দূর করার পাশাপাশি স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক ডিজেলচালিত সেচপাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সিস্টেম লস ও মূল্যনীতি নিয়েও প্রশ্ন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে সিস্টেম লস, বাস্তবসম্মত মূল্যনীতি না থাকা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতাকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, শুধু সরবরাহ বাড়ানোর দিকে নজর দিলে হবে না, গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহের কারণে সরকার বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে।
সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, চুরি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন।
নির্দিষ্ট সময়সূচিতে লোডশেডিংয়ের দাবি
সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
সিস্টেম লস কমানো, সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের স্থায়ী সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের পরিবর্তে অন্তত ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি ও লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির অভাবে জ্বালানি খাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে। শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের ঘাটতি ও সংস্কারহীনতা কাটিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানাসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন।
