দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ফেললেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব ও রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিদায়ী বক্তব্যে তিনি দলের নেতা-কর্মীদের কাছে ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতের জন্য দোয়া কামনা করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে এ আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দুপুর ২টায় শুরু হওয়া সভা চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ফখরুলের বক্তব্যের সময় দলের নেতাদের মধ্যেও আবেগের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও এ সময় আবেগাপ্লুত দেখা যায়।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটদান পদ্ধতি সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের অবহিত করেন এবং দলের মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি জানান। নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনটি শূন্য হবে।
কান্নায় ভেঙে পড়েন ফখরুল
চিফ হুইপের পর বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে শুরুতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মির্জা ফখরুল। সংসদ সদস্যদের সামনে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার কথা বলতে গিয়ে তিনি কয়েকবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বক্তব্যে তিনি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো ভুল হয়ে থাকলে কিংবা তার অজান্তে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি বলেন, দল তাকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তিনি তার মর্যাদা রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করবেন না।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর সহকর্মীদের অভাব অনুভব করবেন বলেও জানান ফখরুল। এ সময় তিনি সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে দোয়া চান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
‘অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আজকের অবস্থানে এসেছি’
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তিনি আজকের দিনটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, অনেক ত্যাগ ও মূল্য দিয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দলের কঠিন সময়ে ফখরুল সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একাধিকবার কারাবরণ করেও তিনি নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
এ সময় দলীয় সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধভাবে মির্জা ফখরুলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। পাশাপাশি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এমপিদের সতর্ক করলেন তারেক
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন এলাকায় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দলের জন্য কাম্য নয়।
তারেক রহমান বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। ফলে এ নির্বাচন দলের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের কেউ যাতে প্রার্থী না হন, তা আগেভাগেই নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নির্বাচন করে দলীয় সমর্থন দেওয়ার নির্দেশনাও দেন তিনি। এসব প্রার্থীকে জয়ী করতে দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
