ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের স্বাধীন তদন্ত চান সায়মা ওয়াজেদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। তার অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধে তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং সিদ্ধান্তটির কারণও তাকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।

ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত আট মাসে একাধিকবার ডব্লিউএইচও ও সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুসের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন সায়মা ওয়াজেদ। সর্বশেষ গত মাসে আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো এক চিঠিতে সিদ্ধান্তটির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয় ওই চিঠিতে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারান তার মা শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেখ হাসিনার পাশাপাশি সায়মা ওয়াজেদকেও কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয়।

এর প্রায় চার মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ জুলাই সায়মা ওয়াজেদকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। সে সময় একজনকে ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তার সেই মেয়াদও শেষ হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ ডব্লিউএইচওর সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতদুষ্ট ও হয়রানিমূলক বলে অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে এক বছরের বেশি সময় ধরে ছুটিতে থাকার সময়ে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিও জানতে চেয়েছেন তিনি।

তার দাবি, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে তাকে ছুটিতে পাঠানোর আগে যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের পাঠানো কয়েকটি ইমেইল পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও তার অভিযোগের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো জবাব দেয়নি।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক কর্মীদের কাছে পাঠানো একটি ইমেইলে সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়টি জানিয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি, তার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

সায়মা ওয়াজেদকে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি।

অন্যদিকে ডব্লিউএইচও এক ইমেইল বার্তায় জানিয়েছে, কর্মীদের অভিযোগ জানানোর জন্য নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে। তবে গোপনীয়তা রক্ষার কারণে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে তারা মন্তব্য করে না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদের অভিযোগ, ডব্লিউএইচও সরাসরি দুদক ও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করেছে।

নয়াদিল্লিতে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়া সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছেও বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করে তার সম্মানহানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তার দাবি, যোগ্যতা ও স্বাস্থ্য খাতে অবদান বিবেচনা না করে শুধু শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণে তাকে নিশানা করা হয়েছে।

ভারত সরকারও উপযুক্ত মাধ্যমে বিষয়টি ডব্লিউএইচওর কাছে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক অনুরোধ পাওয়ার পরপরই সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ডব্লিউএইচওর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সূত্র দাবি করেছে, নির্বাচিত একজন আঞ্চলিক পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সংস্থাটি এখনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেয়নি।

আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, সায়মা ওয়াজেদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতামত বা অংশগ্রহণ ছাড়াই দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার ম্যান্ডেট পরিবর্তন করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিচালকরা মূলত তাদের নির্বাচিত করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছেই দায়বদ্ধ বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

২০২৩ সালের নির্বাচনে ১০ ভোটের মধ্যে ভারতের ভোটসহ আটটি ভোট পেয়েছিলেন সায়মা ওয়াজেদ। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি পাঁচ বছরের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। তবে সায়মা ওয়াজেদকে স্বেচ্ছায় পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সায়মা ওয়াজেদের পক্ষ থেকে মূলত তার ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, কারণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে।