প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলি ঘিরে উত্তেজনা, কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগে তদন্তের দাবি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলিকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে কর্মরত এক অফিস সহকারীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সংগঠন।

কর্মচারী সংগঠনের লিখিত আবেদনে বলা হয়, গত ১০ আগস্ট প্রশাসনিক ব্লকে দায়িত্ব পালনকালে অফিস সহকারী মো. আবু হানিফ ভূঁইয়া কয়েকজন চিকিৎসকের হামলার শিকার হন। তাদের দাবি, একটি কক্ষে তালা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়।

সংগঠনের ভাষ্য, কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

বদলি আদেশ নিয়ে বিতর্ক

ঘটনার আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৮ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলামকে ঢাকা মেডিকেলে এবং ঢামেকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে ময়মনসিংহে বদলি করে। প্রজ্ঞাপনে তিন কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ ছিল।

কর্মচারী প্রতিনিধিদের দাবি, বদলি হওয়া কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের আগেই হাসপাতালে এসে কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ নিয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি আলী আহমেদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। পরে ওই বদলিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

চিকিৎসকদের বক্তব্য

ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির পর পরিস্থিতি আন্দোলনে রূপ নিলেও আলোচনার মাধ্যমে তা মিটে গেছে।

তার ভাষ্য, মন্ত্রণালয় সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করবে। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপাতত বদলি হওয়া দুই কর্মকর্তার কেউই নতুন কর্মস্থলে যোগ দিচ্ছেন না। তবে ওই বদলির সঙ্গে সংঘর্ষের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত নন।

হাসপাতাল পরিচালকের প্রতিক্রিয়া

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বদলি সরকারি চাকরির নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ব্যক্তিস্বার্থে চাপ সৃষ্টি বা জোরপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও জানান, টেন্ডার নিয়ে তদবির ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হুমকির অভিযোগ তার নজরে এসেছে। এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

কর্মচারীদের অবস্থান

চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শিপন মিয়া বলেন, কর্মচারীর গায়ে হাত তোলা মেনে নেওয়া যায় না। তারা হাসপাতাল পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দেবেন।

কর্মচারী সংগঠনের ভাষ্য, তারা কোনো ব্যক্তিগত বিরোধে জড়াতে চান না। তাদের দাবি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের কর্মচারীদের প্রতিনিধি আজিজ বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে সম্প্রতি প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলি ও একজন কর্মচারীর ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ময়মনসিংহের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বে যোগদানের আগেই হাসপাতালে এসে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হুমকি দেন। পরে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি আলী আহমেদ তাকে নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্বে যোগদানের অনুরোধ করলে তাদের মধ্যে বাদানুবাদ হয়।

আজিজের অভিযোগ, পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তার বদলিকে কেন্দ্র করে কয়েকজন চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী তার কক্ষে তালা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় দায়িত্বে থাকা কর্মচারী মোহাম্মদ হানিফ তালা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে মারধর করা হয়।

তিনি বলেন, কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন কর্মচারীর ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

আজিজ বলেন, কর্মচারীদের পক্ষ থেকে কয়েকজন চিকিৎসকের নাম অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে আউটডোর সার্জারির আবাসিক সার্জন ডা. অভি, অর্থোপেডিকস বিভাগের আরএস ডা. ফুয়াদ এবং ডা. জাবেদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তিগত বিরোধে যেতে চাই না। আমরা চাই ঢাকা মেডিকেল কলেজে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ বজায় থাকুক। চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থী সবাই যেন পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”

আজিজ জানান, বিষয়টি নিয়ে মহাপরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি সংক্রান্ত বিষয়টি পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের একমাত্র দাবি, আমরা যেন নিরাপদে ও নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারি। কর্মচারীর ওপর হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”