- নিজস্ব প্রতিবেদক
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভয়, চাপ, পক্ষপাত বা বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার বিষয় নয়। এ স্বাধীনতা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসনিক, আর্থিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যানুয়াল ল লেকচার-২০২৬’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তাঁর প্রবন্ধের বিষয় ছিল ‘বিয়ন্ড জুডিশিয়াল ইন্ডিপেনডেন্স: কনস্টিটিউশনাল আইডেন্টিটি অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট ফর ইনস্টিটিউশনাল অটোনমি ইন বাংলাদেশ’।
প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিচয় ও ইতিহাস, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তন, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি ও ধারাবাহিকতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, সাংবিধানিক সরকারব্যবস্থার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য। তবে একজন বিচারক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। বিচারকদের নিয়োগ, প্রশাসন, অর্থায়ন ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনাসহ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য বিচার বিভাগের নিজস্ব কাঠামো ও সক্ষমতা থাকতে হবে।
তিনি বলেন, একজন বিচারক ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন হতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসিত নাও হতে পারে। নিয়োগ যদি বাইরের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পছন্দের ওপর নির্ভর করে, বিচার বিভাগের প্রশাসন যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় অঙ্গের ওপর কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল থাকে এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে শুধু বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট নয়।
তাঁর মতে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বলতে এমন কাঠামো, কর্তৃত্ব ও বাস্তব সক্ষমতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে বিচার বিভাগ বিচারিক ক্ষমতার সংরক্ষণ ও প্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিজস্বভাবে পরিচালনা করতে পারে।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, স্বায়ত্তশাসিত বিচার বিভাগ এমন কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, যাকে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। স্বাধীনতার সঙ্গে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সমন্বয় থাকতে হবে। বিচার বিভাগের জবাবদিহি রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে নয়, আইনের কাছে হওয়া উচিত।
‘না’ বলার সক্ষমতা থাকতে হবে
বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিচয় প্রসঙ্গে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সাংবিধানিক আদর্শের ঘাটতি খুব বেশি ছিল না। কিন্তু এসব আদর্শকে দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের মতো শক্তিশালী, স্বাধীন ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক বয়ান দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান রাতারাতি তৈরি হয় না। প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রয়োজন ধৈর্য, ধারাবাহিকতা, নিয়ম, সংযম ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি। প্রয়োজনে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা পাওয়া ব্যক্তিকেও ‘না’ বলার সক্ষমতা রাখতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে একটি ‘সাংবিধানিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, ওই সময় দেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার মধ্যে থাকা দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও ব্যক্তিনির্ভরতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগও তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশ্নটি শুধু ছিল না কে ভিন্নভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, কীভাবে ক্ষমতাকেই টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়।
বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের প্রস্তাব
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে শুধু সাংবিধানিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কার্যকর করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং অর্থবহ বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
বিচারক নিয়োগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও জনগণের আস্থা ধরে রাখতে নিয়োগপ্রক্রিয়া মেধা, সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছ মানদণ্ডের ভিত্তিতে হতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ বা আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ হলে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়।
একই সঙ্গে স্বাধীনতা যেন অদক্ষতা, দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারিতার আড়াল না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, বিচার বিভাগের জবাবদিহি থাকতে হবে। তবে সেই জবাবদিহির প্রক্রিয়া হতে হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
টেকসই সংস্কারের ওপর গুরুত্ব
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্থায়িত্বের প্রসঙ্গে সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, কোনো সংস্কার যদি শুধু একজন সংস্কারক বা নির্দিষ্ট নেতৃত্বের মেয়াদ পর্যন্ত টিকে থাকে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বলা যায় না। সেটি সাময়িক প্রশাসনিক পরিবর্তন মাত্র।
তিনি বলেন, এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, যা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও নিজস্ব মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। ভালো নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণাবলি দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আদালত, সংসদ, সরকারি প্রশাসন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্মৃতি ও ধারাবাহিকতা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান যখন বারবার রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়, পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয় কিংবা ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী পুনর্গঠন করা হয়, তখন সেই প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি হারিয়ে যায়।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা এক হাত থেকে অন্য হাতে গেলেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে উদ্ভাবন করা যায় না। তাই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
সাংবিধানিক আদর্শ বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানই মূল
বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, সাংবিধানিকতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে শুধু কতবার সাংবিধানিক আদর্শ ঘোষণা করা হয়েছে তার ওপর নয়; বরং সেই আদর্শ সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে সক্ষম প্রতিষ্ঠান কতটা গড়ে তোলা হয়েছে, তার ওপর।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমাদের বলে দেয় কী সুরক্ষিত রাখতে হবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বলে দেয় কীভাবে সেই সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী করা যায়।
সাবেক প্রধান বিচারপতির মতে, ২০২৪ সালের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক বৈধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সব সময় এক বিষয় নয়। একটি সাংবিধানিক মুহূর্ত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারে কেবল শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান।
তিনি বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সংস্কার-অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কীভাবে ভিন্নভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়, তা নয়; বরং কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, যেখানে ক্ষমতাই সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের অধীন থাকবে।
অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। স্বাগত বক্তব্য দেন আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি ন্যায়, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহি, দায়িত্বশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করা জরুরি। আইন, বিধি-বিধান ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
