- নিজস্ব প্রতিবেদক
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনদের দাবি উঠেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নথিতেও আগুনের পর চারজনকে মৃত অবস্থায় আনার তথ্য রয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন বলছে, পদদলিত হয়ে কারও মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় ১১ নম্বর লিফটের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আগুনের চেয়ে ধোঁয়া ও আতঙ্কেই পরিস্থিতি বেশি জটিল হয়ে ওঠে।
আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনরা দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেন। এতে সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়। কয়েকজন আহত হন। কারও হাত-পা কেটে যাওয়া এবং মাথায় আঘাত পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
মৃত্যুর দাবি স্বজনদের
অগ্নিকাণ্ডের পর সিঁড়িতে পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। তাদের মধ্যে ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহজাহান মনির (৪৫), তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং ফুলবাড়িয়ার বিদ্যানন্দ গ্রামের রমজান আলী (৩৮) রয়েছেন। এছাড়া নেত্রকোণার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০) নামের এক নারীর মৃত্যুর তথ্য হাসপাতালের নথিতে রয়েছে।
শাহজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। স্বজনদের দাবি, আগুন লাগার পর স্ত্রী ও শ্যালিকার সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় পেছন থেকে মানুষের ধাক্কায় তিনি পড়ে যান।
তার স্ত্রী হারিসা বেগম জানান, কয়েক ধাপ নামার পর তারা পড়ে যান। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফেরার পর স্বামীকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে জানতে পারেন, ভিড়ের মধ্যে পড়ে তার স্বামী মারা গেছেন।
শাহজাহান মনিরের মরদেহ সোমবার রাতেই স্বজনরা বাড়িতে নিয়ে যান। মঙ্গলবার জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মাকে বাঁচাতে পারেননি মেয়ে
কুলসুম আক্তার প্রায় ১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে তিনি ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার।
মিম জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি, তার মা ও ভাই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। হুড়োহুড়ির মধ্যে তারা পড়ে যান। তিনি উঠে ভাইকে টেনে তুলতে পারলেও মাকে তুলতে পারেননি। মানুষের চাপের মধ্যে তার মা নিচে পড়ে থাকেন।
পরে কুলসুমকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে স্বজনরা জানান। মঙ্গলবার সকালে জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
কুলসুমের স্বজনদের অভিযোগ, আগুনের সময় তিনি হাসপাতালের ভেতরেই ছিলেন। দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা পেলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারত বলেও দাবি করেন তার মেয়ে।
সিঁড়িতে আটকা পড়ে রমজানের মৃত্যু
রমজান আলী সোমবার সকালে বুকের ব্যথা নিয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে দুপুরে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিট উল্লেখ রয়েছে। স্বজনদের দাবি, আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে তিনি পড়ে যান এবং সেখানেই মারা যান।
রমজানের স্ত্রী খাদিজা আক্তার বলেন, আগুনের পর সবাই একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলে তিনিও পড়ে যান। একপর্যায়ে সিঁড়ির মাঝখানে আটকা পড়েন। পরে জানতে পারেন, তার স্বামী মারা গেছেন।
রমজানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, হাসপাতাল থেকে তাদের ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস দেওয়া হয়েছে। সেখানে মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিট উল্লেখ রয়েছে।
চারজনকে মৃত অবস্থায় আনার তথ্য
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টার অনুযায়ী, আগুন লাগার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রেজিস্টারের পাতার ছবির সত্যতাও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান নিশ্চিত করেছেন।
তবে তিনি জানান, ওই চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন এমন কোনো তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। মৃতদের শরীরেও পদদলিত হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম দিকে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন এক বার্তায় হাজেরা বেগম, শাহজাহান, রমজান, জাহানারা, কুলসুমা ও অজ্ঞাত এক শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছিলেন। পরে সেই তথ্য পরিবর্তন করা হয়।
রাতে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ আলোচনার পর বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার জানান, পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
তিনি বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, মর্গ, নার্স, চিকিৎসক ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। হাসপাতালের রেজিস্টারও যাচাই করা হয়েছে। এসব যাচাইয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, মৃতের তালিকায় থাকা একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য কয়েকজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। বাকি দুজনের মৃত্যুর কারণ তখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তার ভাষ্য, হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যের সত্যতা তদন্ত করে দেখা হবে।
মৃতের তালিকায় থাকা জাহানারা জীবিত
ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ জানান, জাহানারা নামে যে রোগীকে মৃতের তালিকায় রাখা হয়েছিল, তিনি জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় হাসপাতালের বিভিন্ন নথি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে অসঙ্গতি দেখা দেওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে আরও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর একটি সিঁড়ি বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের একটি সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার সময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তারা জানতে পেরেছে এবং নিরাপত্তার কারণে সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার সময় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি লিফটের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, সেখানে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং আতঙ্কের সময় রোগী ও স্বজনদের ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাসপাতালের নিরাপত্তা ও রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুজন ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ। তার অভিযোগ, জরুরি পরিস্থিতিতে একটি বড় হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন।
আগুনের প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর সংখ্যা এবং মৃত্যুগুলোর সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
