সাতাশতম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিলের কারণে বাদ পড়া প্রার্থীদের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে আদালতের রায় অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। দেড় যুগ পর প্রথম ধাপে ৬৭৩ জন প্রার্থীকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের প্রবেশ পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এসব প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট ক্যাডারে যোগদানের পর বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অথবা সরকার নির্ধারিত অন্য কোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে অনুষ্ঠিত ২৭তম বিসিএস পরীক্ষার প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় ৩ হাজার ৫৬৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। তবে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ওই মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে ওই বছরের জুলাই মাসে দ্বিতীয় দফায় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে উত্তীর্ণ ৩ হাজার ২২৯ জন প্রার্থীকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন। কিন্তু ২০০৮ সালের ৩ জুলাই হাই কোর্ট প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ২৫ জন প্রার্থী আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন।
এরই মধ্যে ২০৫ জন আবেদনকারীর করা আরেকটি রিট আবেদনে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ ২০০৯ সালের ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা অবৈধ ঘোষণা করে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার তিনটি লিভ টু আপিল করে। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারকের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ প্রথম মৌখিক পরীক্ষা বাতিলকে বৈধ ঘোষণা করে হাই কোর্টের রায় বহাল রাখেন। একই সঙ্গে দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা অবৈধ ঘোষণার রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা লিভ টু আপিলগুলো কিছু পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করা হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৩৭ জন প্রার্থীর পক্ষে ১৪০ জন পৃথকভাবে রিভিউ আবেদন করেন। শুনানি শেষে গত ৭ নভেম্বর আপিল বিভাগ তাদের আপিল করার অনুমতি দেয়। এর ধারাবাহিকতায় তিনটি আপিলের শুনানি হয় সর্বোচ্চ আদালতে। চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করে, যেখানে ২০০৯ সালের হাই কোর্টের রায় বহাল রেখে বাদ পড়া ১ হাজার ১৩৭ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই রায়ের আলোকে প্রথম ধাপে ৬৭৩ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়ে এবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের দুই বছর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার এই শিক্ষানবিশকাল অনূর্ধ্ব দুই বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারবে। শিক্ষানবিশকালে কেউ চাকরিতে বহাল থাকার অনুপযোগী বিবেচিত হলে, কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই এবং পিএসসির সঙ্গে পরামর্শ না করেই তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা যাবে।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণ শেষে বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং শিক্ষানবিশকাল সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন করার শর্তে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হবে। নিয়োগের শর্ত হিসেবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে নিয়োগপ্রাপ্তদের নিজ নিজ ব্যাচের প্রথম যে তারিখে নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল, সেই তারিখ থেকেই ভূতাপেক্ষভাবে নিয়োগ কার্যকর হবে।
ফলে তারা তাদের ব্যাচের প্রথম নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানের তারিখ অনুযায়ী ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা পাবেন। তবে এর ফলে তারা কোনো ধরনের বকেয়া আর্থিক সুবিধা পাবেন না।
