হাই কোর্টে অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক জামিন দেওয়ার ঘটনাকে ‘আশঙ্কাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের জামিনের প্রসঙ্গ টেনে আইন উপদেষ্টা বলেন, একজন ভয়ঙ্কর ব্যক্তি যদি অস্বাভাবিকভাবে জামিন পেয়ে বের হয়ে এসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের ওপর হামলা করতে পারে, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, এ ধরনের জামিন হলে সরকার প্রচণ্ড শঙ্কিত, আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন বোধ করে।
হাই কোর্টের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, নিয়ন্ত্রণ থাকার কথাও নয়। হাই কোর্টের অভিভাবক হচ্ছেন মাননীয় প্রধান বিচারপতি।
আইন উপদেষ্টা জানান, বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের শেষ কর্মদিবসে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে তিনি সুপ্রিম কোর্টে এসেছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে তিনি বলেন, জাতির এক অত্যন্ত সন্ধিক্ষণে তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে বিচার বিভাগীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেসব আইন প্রণয়ন হয়েছে, সেগুলোর পেছনে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সমর্থন ছিল বলেও উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল।
ব্রিফিংয়ের সময় পরবর্তী ২৬তম প্রধান বিচারপতি কে হচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়। এ বিষয়ে এককভাবে কিছু বলার এখতিয়ার তার নেই। তিনি জানান, তিন–চার দিনের মধ্যেই বিষয়টি জানা যাবে।
আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, হাই কোর্টের কোনো কোনো বেঞ্চ অস্বাভাবিকভাবে জামিন দিচ্ছে—এ নিয়ে তিনি আগেও প্রধান বিচারপতির কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন, এবারও জানিয়েছেন। তিনি জানান, এর আগে কিছু বেঞ্চ থেকে চার ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ মামলায় জামিন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় প্রধান বিচারপতি সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোকে ডেকে পাঠিয়ে নিজের মতো করে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এরপর এ ধরনের জামিন কিছুটা কমলেও এখনো তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া ওসমানি হাদিকে গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে গুলি করা হয়। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদের নাম আসে। ১৪ ডিসেম্বর রাতে পল্টন থানায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন, যেখানে আসামি হিসেবে শুধু ফয়সালের নাম উল্লেখ করা হয় এবং বাকিদের ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ হিসেবে দেখানো হয়।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ফয়সাল করিম মাসুদ একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মামলার তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার আদাবরের একটি স্কুলে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের মামলার আসামি ছিলেন। ওই বছরের ৭ নভেম্বর আদাবর এলাকা থেকে র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে। তখন তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মুঠোফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধারের তথ্য দেয় র্যাব। ওই মামলায় চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি হাই কোর্ট থেকে তিনি জামিন পান বলে হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর জানা যায়। তার জামিন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই হাই কোর্টে জামিন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন আইন উপদেষ্টা। প্রধান বিচারপতিকে হাই কোর্টের অভিভাবক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগেও এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন, আজ আবারও জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই তিনি বিষয়টি তুলবেন।
আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা একের পর এক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বলে আলোচনা হচ্ছে। তার দলের অনুসারীরা যদি জামিন পায়, তা জামিনের নিয়মনীতি অনুযায়ী হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, যাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে, সেই ব্যক্তি যদি মুক্তি পেয়ে কাউকে খুন করতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকার পরও জামিন দেওয়া হলে সেই দায়–দায়িত্ব বিচারকদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে সন্তানদের রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন হলে কঠোর ভাষায় হলেও বিষয়টি বলতে হবে। নতুন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে প্রথম সভাতেই তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দেন।
আইনগতভাবে যেসব ক্ষেত্রে জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে, সেখানে অবশ্যই জামিন দেওয়া যাবে উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট কারণ আছে যে কেউ জামিনে মুক্তি পেয়ে মানুষকে হত্যা করতে পারে, সে ক্ষেত্রে জামিন দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়টি প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
