গুরুতর অসাদাচরণ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চীনের শীর্ষ দুই সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত

গুরুতর অসাদাচরণ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চীনের সামরিক বাহিনীর দুই প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। শনিবার দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

তদন্তের মুখে পড়া দুই কর্মকর্তা হলেন—ঝাং ওউশিয়া ও লিউ ঝেনলি। ঝাং ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্তরের রাজনৈতিক পরিষদ পলিটব্যুরোর সদস্য এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান। অন্যদিকে লিউ ঝেনলি সিএমসির জয়েন্ট স্টাফ বিভাগের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

৭৫ বছর বয়সী ঝাং ওউশিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্রদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আধুনিকায়ন কার্যক্রমে অভিজ্ঞ এই কর্মকর্তা চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের অল্প কয়েকজন নেতার একজন, যাদের সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি চীনের সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণকারী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সিএমসির দুই ভাইস চেয়ারম্যানের একজন ছিলেন।

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিং যে বিস্তৃত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেন, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনী। ওই অভিযানের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৩ সালে, যখন পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) রকেট বাহিনীকেও তদন্তের আওতায় আনা হয়।

দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জেনারেল হে ওয়েইদংসহ মোট আটজন শীর্ষ জেনারেলকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। ওয়েইদং শি জিনপিংয়ের অধীনে ঝাং ওউশিয়ার সঙ্গে সিএমসি-তে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতির দায়ে চীনের ক্ষমতাসীন পার্টি দুই সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকেও বরখাস্ত করেছে। এই ধারাবাহিক ‘শুদ্ধি অভিযান’ দেশটির সামরিক বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি এর প্রভাব পড়েছে চীনের বড় বড় প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপরও।

কাজের বিস্তৃতি, পিএলএ-তে গভীর প্রভাব এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ঝাং ওউশিয়ার বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে বিদেশি কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মনোযোগ আরও বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও চীন কয়েক দশকের মধ্যে সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি, তবে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে দেশটির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিয়মিত সামরিক চাপ ও ‘ভয় দেখানোর’ কৌশল অব্যাহত রেখেছে বেইজিং। চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করলেও তাইপে এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বলপ্রয়োগের হুমকি থাকলেও এখন পর্যন্ত চীন মূলত দ্বীপটির আশপাশে সামরিক মহড়ার মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে।

তাইওয়ানের আশপাশে বেইজিং এখন পর্যন্ত যত সামরিক মহড়া চালিয়েছে, তার মধ্যে গত বছরের শেষের দিকের মহড়াটি ছিল সবচেয়ে বড়।

ঝাং ওউশিয়াকে সরিয়ে দেওয়া হলে তিনি হবেন ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চলা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর সিএমসি থেকে পদচ্যুত দ্বিতীয় কোনো জেনারেল। গত বছরের ২০ নভেম্বরের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ওই দিন তিনি মস্কোতে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

এর আগে ওই মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ঝাং ‘ভুয়া আনুগত্য’ এবং ‘দ্বিমুখী মানুষদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। পাশাপাশি তিনি সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা ‘বিষাক্ত প্রভাব ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা’ নির্মূলের আহ্বানও জানিয়েছিলেন।