বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: শুল্ক কমানো থেকে বিশেষ সুবিধা যা আছে

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) দুদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের জন্য এই চুক্তিতে ‘বিশেষ সুবিধা’ রাখা হয়েছে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে চুক্তির বিস্তারিত details না জানালেও রোববার সরকারপ্রধানের কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শর্ত, শুল্ক কাঠামো ও বাজার সুবিধার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের কথা ছিল, যা পরে দরকষাকষিতে ২০ শতাংশে নামে। আগে থেকে  ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে মিলিয়ে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছিল ৩৫ শতাংশ। সর্বশেষ এই চুক্তির মাধ্যমে তা কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, প্রায় নয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে এই শুল্ক হার নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

চুক্তিতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া, বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ আগে থেকেই ডব্লিউটিও ট্রিপস, আইএলও-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে থাকায় নতুন কোনো অতিরিক্ত শর্ত আরোপ হয়নি বলে দাবি সরকারের। বরং বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ সুবিধা যেখানে

টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে এই চুক্তিতে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২৫০০টি পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক ও কাঠজাত পণ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে বাংলাদেশের শুল্ক কমানো

অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ১৩২টি পণ্যে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব চুক্তিতে রয়েছে। এর মধ্যে-

· ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যে চুক্তি কার্যকরের দিন থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা
· ১ হাজার ৫৩৮টি পণ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক শূন্যে নামানো
· ৬৭২টি পণ্যে ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক শূন্যে নামানো
· ৩২৬টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি

সরকার বলছে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত এ ধরনের চুক্তিতে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর বিধান ছিল না; বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা রাখা হয়েছে।

চুক্তিতে আরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-

· পেপারলেস ট্রেড
· আইপিআর এনফোর্সমেন্ট (মেধাস্বত্ব সুরক্ষা)
· ই-কমার্সে পার্মানেন্ট মোরাটোরিয়াম সমর্থন
· নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার কমানো
· কনফর্মিটি অ্যাসেসমেন্ট
· পরিবেশ ও শ্রম মানদণ্ড বাস্তবায়ন

ডিজিটাল ট্রেড, প্রযুক্তি সহযোগিতা, মার্কিন বিনিয়োগে কিছু খাতে ইকুইটি সীমা উদারীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর কথাও চুক্তিতে রয়েছে।

চুক্তিতে একটি ‘এক্সিট ক্লজ’ রাখা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট শর্তে চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ দেবে।

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর আশা প্রকাশ করেছে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।