মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় জরুরি সহায়তা হিসেবে ভারতের কাছে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে সরকার।
বুধবার (১১ মার্চ ) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠক শেষে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তার অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি পাওয়া গেছে এবং তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও সাংবাদিকদের জানান, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য পাইপলাইন চালু আছে। এই অবকাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে ডিজেল আসে। প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চালু রয়েছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পাঠানোর দুই দিনের মধ্যেই তা বাংলাদেশে পৌঁছে যায়, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে দ্রুত ও সহজ করেছে।
সম্প্রতি এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং কয়েক হাজার মেট্রিক টন তেল ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল এভাবে আমদানি করা সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন ও নুমালিগড় রিফাইনারির কাছ থেকে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার উদ্যোগও বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ব্রুনেই থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকেও জ্বালানি আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জন্য একটি ঝুঁকি ছিল। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উত্তেজনা সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এ কারণে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কৌশলকে এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থার কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত জ্বালানি পাওয়া তুলনামূলক সহজ। ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
