রফিকুল ইসলাম
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো দ্রুত সংসদে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, এসব অধ্যাদেশ গ্রহণ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগগুলো কার্যকারিতা হারাবে।
শুক্রবার নিজের ফেসবুক পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন—
“অন্তর্বর্তী সরকারে আমাদের সময়টা ছিল দুর্দান্ত এক রোলার কোস্টারে চড়ে বসার মতো। সেখানে উত্তেজনা, রোমাঞ্চ, আনন্দ ছিল; ছিল অনিশ্চয়তাও। তবে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল এবং আমরা অচেনা রোলার কোস্টারে চড়েই সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি।
আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। এর মধ্যে ১২ মার্চের নতুন সংসদের অধিবেশন সামনে রেখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংস্কারের বিষয়গুলো। আমাদের আমলে এসব সংস্কার সম্পাদন করা হয়েছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে।”
তিনি আরও বলেন—
“এই অধ্যাদেশগুলো অকেজো ও অর্থহীন হয়ে পড়বে, যদি সংসদ তার প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে এগুলো গ্রহণ না করে। এসব অধ্যাদেশকে সংসদের আইনে পরিণত করা সরকারের জন্য কঠিন কাজ নয়। কারণ, এগুলো দ্বারা সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদের পরিবর্তন আনা হয়নি বা এতে সংবিধানপরিপন্থী কোনো বিধান রাখা হয়নি। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সম্পাদিত এসব সংস্কারের গুরুত্ব সাংবিধানিক সংস্কারের চেয়ে কম নয়।”
পোস্টে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত এবং বাকি ১১৯টি অধ্যাদেশের প্রায় সবই সংস্কারধর্মী। এর মধ্যে ৩৮টি আইন মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করেছে।
আইন প্রণয়নের বিষয়ে তিনি বলেন—
“এসব আইন প্রণয়নের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা হিসেবে আমি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম বলে এর সুফল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। এ কাজে আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তারাও যুক্ত ছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাপক আনুষ্ঠানিক পরামর্শ করা হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে।”
আইন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে তিনি বলেন—
“আইন ও বিচারব্যবস্থা–সম্পর্কিত এসব অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের ভোগান্তি হ্রাস ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এর কয়েকটির পরিমেয় সুফল ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে।”
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন—
“আইনগত সহায়তা–সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির হার কমপক্ষে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেওয়ানি কার্যবিধির সংস্কারের মাধ্যমে দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি কম সময়ে করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির সংস্কারের মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ায় মানুষের অধিকার আরও সুরক্ষিত হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন আইনের সংশোধনের ফলে জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি কমেছে।”
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের উন্নয়ন ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন—
“ফ্যাসিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেসব ক্ষেত্রে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকালে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যেসব তরুণ রাজপথে নেমেছিল, তাদের প্রতি সুবিচার করতে হলে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা প্রয়োজন।”
সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন—
“অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের বিশদ প্রস্তাব তৈরি করেছিল নিজের ক্ষমতা ধরে রাখা বা বৃদ্ধি করার জন্য নয়; বরং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করে একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।”
সবশেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, অতীতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার হয়েছে, তেমনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
