জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ ও জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এক বর্ণাঢ্য ও প্রাণবন্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার রাতের অধিবেশনে সরকারি দলের সদস্যরা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অঙ্গীকার এবং সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন, অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এ সনদ কার্যকর না করার কারণে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সরকারি দলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক মূলতুবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের বিষয়বস্তু ছিল “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: ভবিষ্যতের পথরেখা”, যা সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও সংযোজন সংক্রান্ত নানা প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদ একটি স্ব-ব্যাখ্যায়িত দলিল। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি সনদের ভেতরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তিনি গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানকে বাইরের কোনো প্রয়াসে প্রভাবিত করার প্রস্তাবকে ‘সংবিধানের ওপর প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি উদাহরণ টানেন, যেমন পানের মধ্যে ভালো অংশের সাথে পচা অংশ মিশিয়ে দিলে তা গ্রহণযোগ্য নয়, একইভাবে আইন প্রণয়নে আইনি কাঠামো ব্যতীত কিছু করা যায় না।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, “সংবিধানে সংস্কার ও সংশোধনের প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারিত আছে। রিফর্ম বা পরিবর্তন আনা যেতে পারে, কিন্তু তা আইনি রূপ দিতে হলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ মেনে সংসদে সংশোধন করতে হবে। অন্য কোনো শর্টকাট নেই।”
বিরোধী দলের নেতা ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে এই সংসদ কাজ করছে। তাই সরকারের উচিত আরও ধৈর্য দেখানো। সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ নয়, বরং সংবিধান অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা উচিত। পার্থ বলেন, “আমরা চাই জুলাই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানের ভেতরে থেকে আসুক এবং সাংবিধানিক রীতিনীতি মেনে কার্যকর হোক।”
আন্দালিব পার্থ একটি রূপক গল্প তুলে ধরে বলেন, যারা আইন বুঝে না তারা বারবার বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। উদাহরণ দেন, একজনের বাড়ির মুরগি প্রতিবেশীর জবাই হলে সেই প্রতিবেশী ১০ বছরের জেলের দাবি করলে সেটি আইনগতভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি বলেন, “গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস রাখি, সংবিধানের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনা উচিত।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বিএনপির অবস্থান সমালোচনা করে বলেন, ঐক্যমত্য কমিশনের আলোচনার পরে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরেখা মানতে চাইছে না। তিনি দাবি করেন, কিছু বিশেষ ‘নোট’ সংযোজনের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। হোসেন বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে সংবিধান পুরোপুরি মানা যায়নি, তবে জনগণের অভিপ্রায়কে টেকসই করতে ‘জুলাই সনদ আদেশ’ জারি হয়েছে।
সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, জুলাই বিপ্লব ও আগস্ট আন্দোলনের শহীদ যোদ্ধাদের স্মরণে এ প্রস্তাব আনা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের দল ও সংসদীয় দল প্রস্তাবের কোনো অংশ বাদ দেবে না। প্রত্যেকটি বিষয় সংসদের রেকর্ডে থাকবে।”
অধিবেশনে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ব্যারিস্টার পার্থ, আখতার হোসেন, কাজী এনামুল হক, মীর মো. হেলালউদ্দিন ও মসিউর রহমানসহ বিভিন্ন দলের নেতা ও সংসদ সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। তাদের বিতর্কপূর্ণ বক্তব্যে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি যুক্তি, সমালোচনা ও প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয়েছে।
বিতর্ক শেষে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে। তিনি সতর্ক করেছেন যে, সংবিধান ও আইন মেনে কার্যক্রম না চললে ভবিষ্যতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে এই অধিবেশন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, গণভোট ও আইন প্রণয়নের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এখনও তীব্র বিতর্ক বিদ্যমান।
