ক্রুড তেল সংকটে বন্ধ ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন, কনডেনসেটে সীমিত কার্যক্রম চলবে

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)-এর ক্রুড অয়েল পরিশোধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের মজুদ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাওয়ায় রোববার বিকেলে শেষবারের মতো উৎপাদন চালিয়ে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

ইআরএল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত প্রায় দুই মাস ধরে ক্রুড তেল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি।

তবে তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকবে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড তেল ইআরএলে পরিশোধন করা হয় এবং অবশিষ্ট প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত তেল সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।

গত মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৭টি জাহাজে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল এসেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল আমদানি করা হয়। এপ্রিল মাসেও নতুন চালান দেশে পৌঁছেছে।

শেষ মজুত ব্যবহার শেষে উৎপাদন বন্ধ

ইআরএল সূত্র জানায়, উৎপাদন সচল রাখতে সর্বশেষ পর্যায়ে মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে থাকা প্রায় ৫ হাজার টন এবং সংরক্ষণ ট্যাংকের তলানিতে থাকা অবশিষ্ট ক্রুড তেল ব্যবহার করা হয়।

সাধারণ সময়ে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টন ক্রুড তেল পরিশোধন করা হলেও সংকটের কারণে উৎপাদন কমিয়ে সাড়ে ৩ হাজার টনে নামানো হয়। সর্বশেষ পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য মজুত দুই হাজার টনের নিচে নেমে গেলে উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় আমদানি ব্যাহত

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে সর্বশেষ ক্রুড তেলের চালান আসে। এরপর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আমদানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

সৌদি আরবের রাস তানুরা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি থেকে নির্ধারিত দুটি চালান বাতিল হওয়ায় টানা ৫৪ দিন কোনো ক্রুড তেল দেশে পৌঁছায়নি—যা ইআরএলের ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিকল্প পথে নতুন চালান আসছে

বিপিসি জানিয়েছে, সৌদি আরামকোর কাছ থেকে এক লাখ টন ক্রুড তেল আমদানির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে এবং এ জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে ২১ এপ্রিল চালানটি জাহাজীকরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই চালান পারস্য উপসাগর এড়িয়ে আরব সাগর হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও এক লাখ টন ক্রুড তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যদিও এর ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি।

পরিশোধন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

ইআরএলে মূলত সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান’ ধরনের ক্রুড তেল পরিশোধন করা সম্ভব। অন্য ধরনের ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা না থাকায় বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত তেল সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সরকার বলছে, তাৎক্ষণিক সংকট নেই

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইআরএলের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বর্তমানে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।

তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।