শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে ১,৪৯৬ কোটি টাকা জরিমানা, আজীবন নিষিদ্ধ সালমান-শিবলী

    • অর্থপাচার ঠেকাতে ১১ অগ্রাধিকার মামলায় জোর, অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা

শেয়ারবাজারে বহুল আলোচিত কারসাজি, অনিয়ম ও বিতর্কিত আর্থিক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন তদন্ত ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

প্রশ্নোত্তর পর্বে বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারে অনিয়মের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাজারকে আরও শক্তিশালী করতে কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আলোচিত ১২টি বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত সম্পন্ন করেছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই জরিমানা, নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শিবলী ও সালমানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইস্তিসনা বন্ড সংক্রান্ত তদন্তে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবনের জন্য দেশের পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই ঘটনায় সাবেক বিএসইসি কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদের ওপর পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তদন্তে দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড সংক্রান্ত তদন্তে সালমান এফ রহমানকে আজীবনের জন্য পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

একই ঘটনায় তার ছেলে এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে আজীবন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সরওয়ারকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে আইএএফআইসি ইনভেস্টমেন্টের সাবেক প্রধান নির্বাহী ইমরান আহমেদের বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেডকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেড-সংক্রান্ত তদন্তে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ লিমিটেডের মিউচ্যুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী রিয়াজ ইসলামের বিরুদ্ধে আজীবন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ওই ঘটনাতেও দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগ দুদকে পাঠানো হয়েছে।

ফরচুন শুজ লিমিটেড-সংক্রান্ত তদন্তে আইসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে বিষয়টি দুদকের নজরে আনা হয়েছে।

কয়েকটি তদন্ত এখনো প্রক্রিয়াধীন

সংসদে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়, রিং শাইন টেক্সটাইলস, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং এবিজি লিমিটেড (বসুন্ধরা গ্রুপ) সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনের বিবেচনাধীন রয়েছে।

এ ছাড়া বেস্ট হোল্ডিংসের আইপিও অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সংশ্লিষ্ট তদন্তও স্থগিত রয়েছে। আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, এমেরাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলসের বিষয়ে শুনানি ও পুনঃশুনানি চলমান রয়েছে।

দুই বছরে ১১৪ অনুসন্ধান, ৬৭৫ এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম

অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ১৩ মে পর্যন্ত পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগে ১১৪টি অনুসন্ধান, ১২টি তদন্ত এবং ৬৪টি পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে ৬৭৫টি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং ১৬টি বিষয় তদন্তের জন্য দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বাজার কারসাজির অভিযোগে বেক্সিমকো লিমিটেড, আবুল খায়ের হিরু ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৭০০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে মিথ্যা তথ্য প্রদান ও জালিয়াতির অভিযোগে সালমান এফ রহমান ও আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে মোট ১৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তবে সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে জরিমানার কত টাকা আদায় হয়েছে, কতগুলো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে কিংবা দুদকে পাঠানো অভিযোগের ভিত্তিতে কতগুলো মামলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকারের বিষয়েও কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

অর্থপাচার রোধে ১১ অগ্রাধিকার মামলা

সংসদে অর্থপাচারবিরোধী কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব মামলার তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশে ৯ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত এবং ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে বিদেশে ১৫ হাজার ১১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত এবং ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের মাধ্যমে সংযুক্ত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ১৪২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলার বিচারিক রায় হয়েছে।