চোরাচালান তথ্যের ভুল শনাক্তে ক্রিকেটার নাঈম হেনস্তা, তদন্তে পুলিশি ত্রুটি ও শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগ

চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে আটক, মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালান তথ্যভিত্তিক এক অভিযানে ভুল শনাক্তের বিষয়টি সামনে এসেছে। ঘটনার পর পুলিশি অভিযান, সোর্সের ভূমিকা এবং থানায় নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে, পাশাপাশি তদন্তও শুরু হয়েছে।

শুক্রবার (১৩ জুন) রাতে চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার ফ্লাইওভার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। পরে বিষয়টি নিয়ে শনিবার দিনভর ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

চোরাচালান তথ্য ঘিরে বসানো চেকপোস্ট

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে সম্ভাব্য সোনা চোরাচালানের তথ্যের ভিত্তিতে খুলশী থানার উদ্যোগে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে চেকপোস্ট বসানো হয়। অভিযানের সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামানো হয়, যেখানে ছিলেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান।

প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা ছিল, ওই অটোরিকশার যাত্রীদের মধ্যে চোরাচালান চক্রের কেউ থাকতে পারে। তবে নাঈম নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করলেও পুলিশ সদস্য ও সোর্সের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে শারীরিকভাবে হেনস্তার ঘটনাও ঘটে।

থানায় নেওয়া ও জিজ্ঞাসাবাদ

পরে এসআই শফিকুল ইসলাম তাকে থানায় নিয়ে যান বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। থানায় নেওয়ার পরও নাঈম নিজের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন এবং পরিচয়পত্র দেখান।

এক পর্যায়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, অভিযানের মূল নির্দেশনা ও সমন্বয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। থানার ওসির ভূমিকা নিয়েও পরস্পরবিরোধী দাবি উঠে আসে।

ওসি আরিফুর রহমান দাবি করেন, তিনি অভিযানের বিষয়ে শুরুতে অবগত ছিলেন না এবং পরে ঘটনাস্থলে বিষয়টি জানতে পারেন। অন্যদিকে অভিযানে থাকা এসআইদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওসির নির্দেশেই চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ ও মারধরের বর্ণনা

নাঈম হাসানের বাবা অভিযোগ করেন, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও তার ছেলেকে অপমান ও হেনস্তা করা হয়েছে। তিনি বলেন, থানায় নেওয়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি এবং পরিবারের সঙ্গে আচরণও ছিল অমানবিক।

এদিকে নাঈম নিজেও অভিযোগ করে বলেন, তাকে জোর করে আটক, গলা চেপে ধরা এবং মারধর করা হয়। তিনি দাবি করেন, পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে “আসামি” হিসেবে আচরণ করা হয় এবং শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়।

মামলা ও পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার

ঘটনার পর শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা করেন। মামলায় তিন পুলিশ সদস্য ও একজন সোর্সকে আসামি করা হয়েছে।

পরে অভিযানে জড়িত কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযানের প্রক্রিয়া, তথ্যের উৎস এবং ব্যবহারিক বাস্তবায়ন সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের অবস্থান ও তদন্ত

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চোরাচালান তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হলেও ভুল শনাক্তের কারণে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার পরে ঘটনাটিকে “অপেশাদার আচরণ” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একজনকে আটক করা হয়েছে।

ন্যায়বিচারের আশ্বাস

সিএমপি জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি অভিযানের তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘিরে চট্টগ্রামজুড়ে আলোচনার পাশাপাশি পুলিশের অভিযান পরিচালনা ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।