বৃষ্টির মধ্যেও কেন কমছে না অস্বস্তিকর গরম, জানালেন আবহাওয়াবিদেরা

বর্ষাকাল শুরু হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্যাশিত স্বস্তি মিলছে না। প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, আকাশে মেঘও দেখা যাচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু তারপরও কমছে না গরমের তীব্রতা। বরং বৃষ্টির পর অনেক স্থানে আরও বেশি ভ্যাপসা ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি ও রোদের পালাবদল চলছে। রোববার সকালেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ মেঘলা থাকলেও গরমের তীব্রতা কমেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও একই ধরনের আবহাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা জহুর হোসেন বলেন, বাড়ি থেকে স্টেশন পর্যন্ত অল্প দূরত্ব হলেও রিকশায় আসতে হয়েছে। তারপরও ঘামে ভিজে গেছেন। তাঁর ভাষায়, বৃষ্টি হলেও গরমের কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। ঘর থেকে বের হলেই ঘাম ঝরতে শুরু করছে।

শুধু পথচারী বা কর্মজীবী মানুষ নন, ঘরের ভেতরে অবস্থানকারীরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। রান্নাঘর, কর্মক্ষেত্র কিংবা বাসাবাড়ির সাধারণ কাজকর্মেও অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে অস্বস্তি বাড়ছে।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, বৃষ্টি হলেও কয়েকটি আবহাওয়াগত কারণে গরম কমছে না। এর মধ্যে রয়েছে বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য, বৃষ্টির পর সৃষ্ট সুপ্ত তাপ, পর্যাপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির অভাব এবং মৌসুমি বায়ুর পূর্ণ সক্রিয়তা না পাওয়া।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বৃষ্টির পরও ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে না। মাটি, সড়ক ও নগরাঞ্চলের কংক্রিটের স্থাপনাগুলো তাপ ধরে রাখে। বৃষ্টির পর সেই জমে থাকা তাপ পুনরায় বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিবেশকে উষ্ণ রাখে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। ফলে মানুষের শরীর থেকে নিঃসৃত ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। এ কারণে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় বেশি গরম অনুভূত হয় এবং ভ্যাপসা পরিবেশ তৈরি হয়।

আবুল কালাম মল্লিকের মতে, বর্ষা মৌসুমে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি স্তরে যে মেঘ সৃষ্টি হয়, তা থেকে হওয়া স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টি তাত্ক্ষণিক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে গরম কমাতে পারে না। একটানা ও বিস্তৃত এলাকায় বৃষ্টি হলেই কেবল তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সুযোগ থাকে।

চলতি বছর দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা বিলম্বে হয়েছে। বর্তমানে এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হলেও এখনো পুরোপুরি সক্রিয় অবস্থায় পৌঁছায়নি।

আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা বলেন, মৌসুমি বায়ু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেও এর কার্যকারিতা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। ফলে দেশব্যাপী ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। একই সময়ে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ দিক থেকে প্রচুর আর্দ্র বায়ু প্রবেশ করছে, যা বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়ে ভ্যাপসা গরম সৃষ্টি করছে।

তিনি জানান, বর্তমানে সুন্দরবনসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি পশ্চিমা লঘুচাপ অবস্থান করছে। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকছে এবং গরমও বেশি অনুভূত হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে বৃষ্টি হচ্ছে তার বড় অংশই স্বল্প সময়ের ও বিচ্ছিন্ন প্রকৃতির। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে এবং আর্দ্রতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী ও ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ভূপৃষ্ঠে জমে থাকা তাপও পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।

তাঁদের মতে, মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হয়ে দেশের অধিকাংশ এলাকায় কয়েক দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হলে তবেই অস্বস্তিকর গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। এর আগে পর্যন্ত বৃষ্টি ও রোদের পালাবদলের মধ্যেই ভ্যাপসা আবহাওয়া অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হতে পারে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাও থাকতে পারে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে। সেখানে তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।