ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে সাবেক শিক্ষার্থী দম্পতিসহ ছয়জন হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার (২৮ জুন) একদল নারী শিক্ষার্থী একই মাঠে দলবেঁধে খেলা দেখেন এবং পরে প্রক্টর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেন।
অভিযোগকারী ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, শুক্রবার রাতে ফ্রান্স ও নরওয়ের মধ্যকার ম্যাচ দেখতে তারা নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্টারে নাম লিখে শহীদুল্লাহ হলে প্রবেশ করেন। খেলা শুরুর আগে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাঁদের পরিচয় জানতে চান।
ইমনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচয় দেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে একজন নারী থাকায় প্রশ্ন তোলা হয়, ‘কোন যুক্তিতে একজন নারীকে নিয়ে ছেলেদের হলে খেলা দেখতে এসেছেন?’ তিনি জানান, তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তাঁদের সঙ্গে থাকা নারীও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং তাঁর ছোট ভাই ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
অভিযোগে বলা হয়, পরে আরও কয়েকজন এসে তাঁদের ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক পরিচয় দেওয়া সাজু মিয়া তাঁদের বলেন, ‘আপনাদের আর ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এখনই উঠে হল থেকে বের হয়ে যান। এখানে নারী নিয়ে থাকা যাবে না।’
ইমন আরও দাবি করেন, তাঁদের ছবি তুলে হলের বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, সঙ্গে থাকা একজন বলেন, ওই নারী তাঁর স্ত্রী। এরপরও তাঁদের খেলা না দেখেই হল ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি এ ঘটনার বিচার দাবি করে বলেন, বিশ্বকাপের মতো একটি উৎসবকে ঘিরে ক্যাম্পাসে এ ধরনের ভয়ভীতি, হয়রানি ও দলবদ্ধ চাপ সৃষ্টি বন্ধ হওয়া উচিত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার নিরাপদে খেলা দেখার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজু মিয়া বলেন, তাঁরা কাউকে হেনস্তা করেননি। নিয়মের স্বার্থে শুধু চলে যেতে অনুরোধ করা হয়েছিল। নারীকে নিয়ে কোনো আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক নেতা বলেন, ঘটনাটি নারী হেনস্তা নয়, বরং সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির ঘটনা। বিষয়টিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকালে আর্জেন্টিনা ও জর্ডানের মধ্যকার ম্যাচ দেখতে শহীদুল্লাহ হল মাঠে জড়ো হন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল নারী শিক্ষার্থী। তাঁদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়।
কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহসভাপতি সানজানা চৌধুরী রাত্রী বলেন, একজন নারীকে সঙ্গে থাকার কারণে সাবেক শিক্ষার্থী দম্পতিকে হয়রানি করে খেলা না দেখেই চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানাতেই নারী শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে মাঠে এসে খেলা দেখেছেন। পরে তাঁরা প্রক্টর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ হল শাখাও প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। একই সঙ্গে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবদ্ধ ভয়ভীতি প্রদর্শন, নৈতিকতার নামে হয়রানি এবং নারী শিক্ষার্থীদের চলাচলে বাধা দেওয়ার প্রবণতার নিন্দা জানিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়।
শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক তৌকির হাসান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ তাঁদের কাছে জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর একজন সহকারী প্রক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
