সুন্দরবনের গভীরে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে অসহায়ের মতো ছটফট করছিল একটি চিত্রা হরিণ। প্রাণ বাঁচাতে বারবার চেষ্টা করলেও পায়ে জড়িয়ে থাকা দড়ির ফাঁস আরও শক্ত হয়ে উঠছিল। হরিণটির আর্তনাদ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যান বনকর্মীরা। পরে ফাঁদ কেটে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর বনে অবমুক্ত করা হয়। একই অভিযানে আশপাশ থেকে আরও ১২টি শিকারি ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন সত্যপীর খাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে অভিযানের সময় কোনো শিকারিকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন জানান, টহলের সময় বনের ভেতর থেকে একটি হরিণের আর্তনাদ শুনে বনকর্মীরা শব্দের উৎস অনুসরণ করেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শিকারিদের পাতা ‘ছিটকা ফাঁদে’ একটি চিত্রা হরিণ ঝুলে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ছটফট করতে করতে প্রাণীটি প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। পরে দ্রুত ফাঁদ কেটে হরিণটিকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবমুক্ত করলে সেটি দ্রুত বনের গভীরে চলে যায়।
তিনি আরও জানান, ওই দিন ‘সমান্তরাল রেখা অনুসন্ধান’ পদ্ধতিতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে টহল ও তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় উদ্ধার হওয়া হরিণটির পাশাপাশি আশপাশ থেকে আরও ১২টি ছিটকা ফাঁদ জব্দ করা হয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনে হরিণ শিকারের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ‘ছিটকা ফাঁদ’। শক্ত দড়ি ও গাছের বাঁকানো ডাল ব্যবহার করে এমনভাবে এই ফাঁদ তৈরি করা হয় যে, হরিণের পা ফাঁসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ওপরে ঝুলে যায়। প্রাণীটি যত বেশি মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে, ফাঁস তত শক্ত হতে থাকে।
এ ছাড়া শিকারিরা ‘মালা ফাঁদ’ নামে আরেক ধরনের ফাঁদও ব্যবহার করে। হরিণ চলাচলের পথে চিকন কিন্তু মজবুত দড়ির গোলাকার ফাঁস বসিয়ে রাখা হয়। দৌড়ে যাওয়ার সময় হরিণ সেই ফাঁদে আটকে পড়ে। বন বিভাগের ভাষ্য, এসব ফাঁদে শুধু হরিণ নয়, সুন্দরবনের অন্যান্য বন্য প্রাণীও শিকার হয়।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার মঠবাড়ি ও ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, লোকালয় থেকে শাকবাড়িয়া নদী পার হলেই সুন্দরবনের শুরু। বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শিকারিরা দড়ি নিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থানে ফাঁদ পেতে রাখে। পরে ফাঁদে আটকে পড়া হরিণ জবাই করে বনের ভেতরেই মাংস টুকরা করা হয়। এরপর বিভিন্ন পথে সেই মাংস লোকালয়ে এনে বিক্রি করা হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হাছানুর রহমান বলেন, শিকারিরা শুধু হরিণ নয়, সুন্দরবনের বিভিন্ন বন্য প্রাণীকেও ফাঁদে ফেলে শিকার করে। তাই তিনি সবাইকে বন্য প্রাণী শিকারে কোনো ধরনের সহায়তা না করার, হরিণের মাংস না কেনার এবং শিকারিদের আশ্রয় না দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বন্য প্রাণীর প্রজনন মৌসুম চলায় বনজীবী ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। এ সময় বন বিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি শিকারিদের ধরতে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বনের ভেতরে হরিণ শিকারসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে শিকারি ধরতে সহায়তা করলে ২০ হাজার টাকা এবং বনের বাইরে এমন তথ্য দিলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
