- নিজস্ব প্রতিবেদক
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিফটে আগুন লাগার ঘটনায় হতাহতের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। বুধবার হাসপাতালে গিয়ে প্রায় ৭০ মিনিট সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করলেও আগুন লাগার স্থান ঘুরে দেখেননি তিনি। কথা বলেননি আহত রোগী কিংবা তাঁদের স্বজনদের সঙ্গেও। একই দিনে আগের তদন্ত কমিটি বাতিল করে নতুন ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা ১০ মিনিটে প্রতিমন্ত্রীর গাড়িবহর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছায়। যদিও তাঁর দপ্তরের মঙ্গলবারের সফরসূচিতে সকাল পৌনে ১০টায় হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে পরিদর্শনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম ও চিকিৎসক নেতারা তাঁকে স্বাগত জানান। পরে প্রশাসনিক ভবনের পরিচালকের কক্ষে বৈঠকে বসেন তাঁরা। অসুস্থ থাকায় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন সেখানে ছিলেন না।
বৈঠকে ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ ছাড়াও হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং চিকিৎসক নেতারা ছিলেন।
দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে বৈঠক শেষ হয়। এরপর প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আরও কীভাবে উন্নত করা যায়, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ। তাঁর দাবি, আগুনের আতঙ্কে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়লেও পদদলিত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি।
তিনি বলেন, ‘পাড়া লেগে (পদদলিত হয়ে) কেউ মারা যায়নি। তারা আগুন-আতঙ্কে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল। যারা মারা গেছে, তাদের অভিভাবকের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমরা ওই দিন ক্লিয়ার করে দিয়েছি। যে নিউজটা আসছে ছয়জন মারা গেছে, এর মধ্যে এখনো একজন চিকিৎসাধীন।’
পরে তিনি বলেন, ‘ছয়জনের মৃত্যুর খবর আমরা মিথ্যা প্রমাণিত করেছি। যারা মারা গেছে, তাদের দুজনের স্বাভাবিক মৃত্যু। অন্য দুজন মারা গেছে আগুন-আতঙ্কে। নো পদদলিত মৃত্যু। পদদলিতও না, অগ্নিদগ্ধও না।’
তবে নিহতদের কয়েকজনের পরিবার পদদলিত হয়ে মৃত্যুর দাবি করেছে, এমন বক্তব্যের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিষয়টি তদন্তের ওপর ছেড়ে দেন।
এম ইকবাল হোসেইন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা তদন্ত করার পর যেটা বের হবে, তখন প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারব। দোয়া করেন যেন সবকিছু ভালো থাকে।’
হাসপাতালের বর্তমান সংকট নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হাসপাতালে প্রায় চার গুণ রোগীর চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় সৃষ্ট সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘এটার সলিউশন একদিনে হবে না। আমরা ট্রাই করছি, ফিউচারে কী হবে, এগুলো নিয়ে কথাবার্তা বলেছি। এরপর একটি বড় সভা করা হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের বলেছি, এটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কী কী প্ল্যান করা দরকার, তারা করুক। তখন বলতে পারব। এখন আমি নিজেই জানি না, বলব কীভাবে।’
হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সময় হাসপাতালের উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বদলে গেল অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার পর হতাহতের বিষয় খতিয়ে দেখতে আগে যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আগের কমিটিতে লিফট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুই প্রকৌশলীকে সদস্য রাখা হয়েছিল। তাঁদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমালোচনা ওঠার পর নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
নতুন কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়া। সদস্যসচিব করা হয়েছে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খানকে।
কমিটিতে আরও দুজন চিকিৎসক, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (দক্ষিণ) এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন সহকারী পরিচালক রয়েছেন। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিকেও তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
সেই কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসকে দ্বিতীয় সদস্য এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মাজেদুর রহমানকে তৃতীয় সদস্য করা হয়েছিল।
লিফটে আগুন, পরে আতঙ্ক
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আটতলা ভবনের ১১ নম্বর লিফটে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে লিফটের বাইরের অংশ পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় থাকা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকে দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে আহত হন।
ঘটনার পর কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য সামনে আসে। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণসহ পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানতে এখন নতুন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
