মালয়েশিয়ায় জাল নথির চক্রে ১১ বাংলাদেশি, পৃথক অভিযানে আটক আরও ১৬৩

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের জন্য জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে ১১ বাংলাদেশিকে আটক করেছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহার করে কাজ করার অভিযোগে পৃথক অভিযানে আরও ১৬৩ বাংলাদেশি আটক হয়েছেন। দুই অভিযানে মোট ৩৩৭ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক ১৭৪ জন।

কুয়ালালামপুরে জাল ই-পিএলকেএস (অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভ্রমণ অনুমতিপত্র) ও ভুয়া পুলিশ প্রতিবেদন তৈরির অভিযোগে আটক ১১ বাংলাদেশির মধ্যে একজন নারী। তাঁদের বয়স ২৩ থেকে ৪৮ বছরের মধ্যে। কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে ওই ব্যক্তিদের পরিচালিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জাল নথি তৈরির কার্যক্রমের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবানের বরাতে জানা গেছে, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) কুয়ালালামপুরের জালান চান সো লিনের একটি বাণিজ্যিক এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ‘অপস সারকাপ’ নামের এ অভিযানে একযোগে ১১টি স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে অভিযান শুরু হয়।

অভিযানে ১৮টি ল্যাপটপ, ২১টি প্রিন্টার ও স্ক্যানার, তিনটি মোবাইল ফোন এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের ১০টি আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া তৈরি করা জাল ই-পিএলকেএস এবং ভুয়া পুলিশ প্রতিবেদনও উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিদেশি কর্মীদের জন্য প্রতিটি জাল ই-পিএলকেএস প্রায় ১৫০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত এবং ভুয়া পুলিশ প্রতিবেদন প্রায় ৭০ রিঙ্গিতে তৈরি করে দেওয়া হতো। এসব নথি বিদেশি নাগরিকদের বৈধতা ও পরিচয়সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হতো বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ এখন খতিয়ে দেখছে, জব্দ করা ১০টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট কীভাবে ওই চক্রের হাতে পৌঁছেছে এবং জাল নথি তৈরির কাজে আরও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না।

অভিযান চলাকালে আশপাশের এলাকা থেকেও অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আরও ১৯ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন বাংলাদেশি, দুজন ইন্দোনেশীয় এবং একজন মিয়ানমারের নাগরিক। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৯৫৯/৬৩ সালের অভিবাসন আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার আওতায় তদন্ত চলছে।

অন্য প্রতিষ্ঠানের পারমিটে চাকরি

এদিকে সেপাংয়ে উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার নির্মাণ প্রকল্পে চালানো পৃথক অভিযানে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহার করে কাজ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ১৭৩ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জন বাংলাদেশি, ১৭ জন ইন্দোনেশীয় এবং ৯ জন পাকিস্তানি নাগরিক।

সোমবার সেপাংয়ের একটি আন্তর্জাতিক মোটরস্পোর্টস কেন্দ্রের কাছে উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার নির্মাণস্থল, গুদাম এবং উড়োজাহাজের ইঞ্জিন পরীক্ষার বিভিন্ন স্থাপনায় অভিযান চালানো হয়। জনসাধারণের অভিযোগ পাওয়ার পর এক সপ্তাহ নজরদারি চালিয়ে এ অভিযান পরিচালনা করে পুত্রজায়া অভিবাসন বিভাগের আইন প্রয়োগকারী শাখা।

অভিযানে অভিবাসন বিভাগের ৮৮ কর্মকর্তা অংশ নেন। তাঁরা মোট ২৬১ জনকে তল্লাশি করেন। তাঁদের মধ্যে ২১৭ জন বিদেশি এবং ৪৪ জন মালয়েশীয় নাগরিক।

অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক জাকারিয়া শাবান জানান, তদন্তে দেখা গেছে, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি উপঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে এমন বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাঁদের পিএলকেএস অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে সামাজিক ভ্রমণ অনুমতিপত্রের অপব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

আটক ব্যক্তিদের পরবর্তী তদন্তের জন্য কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিবাসন আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তদন্তে সহায়তার জন্য পাঁচ মালয়েশীয় নাগরিককে সাক্ষী হিসেবে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

জাকারিয়া শাবান বলেন, নির্মাণ, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিমান চলাচল-সংশ্লিষ্ট সহায়ক স্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিদেশি কর্মী নিয়োগ, তাঁদের আশ্রয় বা সুরক্ষা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশি শ্রমবাজারে নতুন সতর্কতা

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খোলার আলোচনা যখন এগোচ্ছে, তখন দেশটিতে জাল নথি ও ওয়ার্ক পারমিটসংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় বাংলাদেশিদের আটকের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অনিয়ম ও শ্রম শোষণের অভিযোগের মধ্যে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল মালয়েশিয়া। এরপর দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।

সম্প্রতি মালয়েশিয়া আরও ৩১২টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটিং এজেন্সি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর আগে দেশটির বিদেশি কর্মী নিয়োগের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল) অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। অনিয়মের অভিযোগে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব এজেন্সি ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছিল। তাঁদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের পাঁচ গুণ পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সাম্প্রতিক অভিযানের ঘটনাগুলোতে পাসপোর্ট, ই-পিএলকেএস, পুলিশ প্রতিবেদন এবং ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহারের বিষয় সামনে এসেছে। ফলে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের বৈধ নথিপত্র ব্যবহার এবং নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।