ছোট সাজ্জাদের সাত মামলার জামিন স্থগিত, স্ত্রীর জামিনও স্থগিত চেম্বার জজ আদালতে

চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নার বিরুদ্ধে যেসব মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো স্থগিত করেছে চেম্বার জজের আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার এ আদেশ দেওয়া হয়।

বুধবার রাতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী যে মামলাগুলোতে জামিন পেয়েছিলেন, সেসব জামিনাদেশ চেম্বার আদালত স্থগিত করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আদালত এ সিদ্ধান্ত নেয়।

এর আগে ছোট সাজ্জাদ মোট সাতটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। একই সময়ে তার স্ত্রী তামান্না চারটি মামলায় জামিন লাভ করেন। গত সপ্তাহে প্রথম দফায় চারটি মামলার জামিননামা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও তিনটি মামলার জামিননামা কারাগারে পৌঁছায়, যদিও সেটি জানা যায় বুধবার।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন তথ্য অনুযায়ী, সাতটি মামলার জামিননামাই গত সপ্তাহে সেখানে পৌঁছেছিল। শুরুতে চারটি মামলার জামিননামা আসে এবং একদিন পর আরও তিনটি মামলার জামিননামা কারাগারে পৌঁছায়। তবে ছোট সাজ্জাদ তখন চট্টগ্রাম কারাগারে না থেকে রাজশাহী কারাগারে অবস্থান করায়, প্রাপ্ত সব জামিননামা সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বরে প্রথম ধাপে যে চারটি মামলায় ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী জামিন পেয়েছিলেন, সেগুলো ছিল হত্যা মামলা। দ্বিতীয় ধাপে ছোট সাজ্জাদ যে তিনটি মামলায় জামিন পান, সেগুলোও হত্যা সংক্রান্ত মামলা। প্রায় কাছাকাছি সময়ে জামিন আদেশ হলেও, আদেশের নথিপত্র চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই মাস।

ছোট সাজ্জাদের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১০টি হত্যা মামলাসহ মোট ১৯টি মামলা রয়েছে। তার স্ত্রী তামান্নার বিরুদ্ধে মোট আটটি মামলা আছে। এর মধ্যেই গত সোমবার আদালত ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীকে আরও দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।

চান্দগাঁও থানার পুলিশ দুটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে। এর একটি মামলা করা হয় গত বছরের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান চলাকালে চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় ফজলে রাব্বী নিহত হওয়ার ঘটনায়। অন্য মামলাটি করা হয় একই সময়ে নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর বাড়ির সামনে সংঘর্ষের ঘটনায়।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের জামালের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন নগরীর বায়েজিদ, অক্সিজেন ও চান্দগাঁও এলাকায় ‘ছোট সাজ্জাদ’ বা ‘বুড়ির নাতি’ নামে পরিচিত। তিনি হুলিয়া নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাজ্জাদ হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

দুই যুগ আগে চট্টগ্রাম শাহ আমানত সেতুর সংযোগ সড়কে দিনের বেলায় আড়াআড়ি করে বাস দাঁড় করিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীবাহী একটি মাইক্রোবাসে গুলি চালিয়ে আটজনকে হত্যার মামলার আসামি ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। তার অনুসারী হিসেবে ছোট সাজ্জাদ বায়েজিদ ও চান্দগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিংমল থেকে পুলিশ ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে। চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে বায়েজিদ থানার ওসিকে মারধরের হুমকি দেওয়াসহ নানা ঘটনায় তিনি আলোচনায় ছিলেন।

গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ ছোট সাজ্জাদকে জেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, গত বছরের আগস্টে অক্সিজেন এলাকায় জোড়া খুন এবং পরে চান্দগাঁও এলাকায় প্রকাশ্যে একজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ছোট সাজ্জাদ জড়িত ছিল। পাশাপাশি প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চাঁদাবাজি, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অপরাধী কার্যক্রমে সে সক্রিয় ছিল।

কমিশনার আরও জানান, দুবাইপ্রবাসী সাজ্জাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে ছোট সাজ্জাদ চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।

এদিকে, নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় গত ৩০ মার্চ ভোর রাতে ধাওয়া করে একটি প্রাইভেটকার থামিয়ে গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যা করা হয় এবং আরও দুজন আহত হন। এ ঘটনায় নিহত বখতেয়ার উদ্দিন মানিকের মা ফিরোজা বেগম সাতজনের নাম উল্লেখ করে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, কারাগারে থাকা ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

এছাড়াও গত ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা এবং ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যার পরও আলোচনায় আসে ছোট সাজ্জাদের নাম।
ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার স্ত্রী তামান্নার ফেইসবুক লাইভে কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে সাজ্জাদকে ছাড়িয়ে আনার কথা বলা, বিরোধী পক্ষকে হুমকি দেওয়াসহ বিভিন্ন বক্তব্য ঘিরেও ব্যাপক আলোচনা হয়। গত ১০ মে জোড়া খুনের একটি মামলায় পুলিশ তামান্নাকে গ্রেপ্তার করে।

পরবর্তীতে গত মাসে ছোট সাজ্জাদকে রাজশাহী কারাগারে এবং তার স্ত্রী তামান্নাকে ফেনী কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।