জুলাই আন্দোলনের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুকে ঘিরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের অভিযোগ উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে। একইসঙ্গে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও দেখেছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় ২৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রাজশাহীতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া মারুফ আল হাসান। মামলাটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের সাত নেতার বিরুদ্ধে চলমান রয়েছে।
জবানবন্দিতে মারুফ দাবি করেন, আন্দোলনের সময় আবু সাঈদের মৃত্যু নিয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা উপহাস ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। তার বক্তব্যে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নাম উঠে আসে।
তিনি আরও বলেন, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র প্রদর্শনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখেছেন তিনি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম আন্দোলনবিরোধী বক্তব্য দিয়ে উসকানি দিয়েছেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। ১৫ জুলাই রাজশাহীতে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরদিন সহিংস পরিস্থিতির কারণে আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানি ঘটে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট রাজশাহীর তালাইমারী এলাকায় বিক্ষোভের জন্য তারা জড়ো হন এবং পরে সাহেব বাজারের দিকে অগ্রসর হন। আলুপট্টি মোড়ের কাছে পৌঁছালে তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে তিনি দাবি করেন। ওই সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি পুলিশের উপস্থিতিতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানান।
এই সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি আহত হন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মারুফ। গুলি তার ডান হাতের কবজির ওপরে লেগে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায় বলে তিনি জানান। আহত অবস্থায় তাকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় এবং পরে একাধিক অস্ত্রোপচার করা হয় বলেও তিনি বলেন। এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন এবং ডান হাত ব্যবহার করতে অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সহযোদ্ধা সাকিব আঞ্জুম নিহত হওয়ার খবর জানতে পারেন এবং পরে আলী রায়হানের মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত হন।
মারুফ দাবি করেন, বিভিন্ন ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি দেখেছেন আন্দোলনের সময় একাধিক ব্যক্তি গুলিবর্ষণে জড়িত ছিল। তিনি এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন এবং মামলার সাত আসামির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট সাতজনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের সবাই বর্তমানে পলাতক বলে জানানো হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও ওয়ালি আসিফ ইনান।
রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদসহ অন্যান্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। পরবর্তী ধাপে আগামী ১৯ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
