ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি কবিতা লিখতেন এবং তিনি গড়ে তুলেছিলেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। তাঁর কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আবৃত্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। সেই হাদির মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্ট ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ভবনে হামলা চালিয়েছে—এমন ঘটনায় হতবাক অভিভাবক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষজন।
হামলার খবর শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না আফরোজা খাতুন নামে এক অভিভাবক।
তিনি বলেন, রাতে ঘরে বসেই তারা আঁচ করেছিলেন যে ছায়ানটে হামলা হতে পারে, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা বুঝতে পারেনি বা প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। তাঁর সন্তান ছায়ানটে পড়াশোনা করে—এটি তাদের কাছে একটি স্কুল। সেই স্কুলেই আগুন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শুক্রবার সকালেই তিনি ছুটে আসেন ছায়ানট ভবনের সামনে।
আফরোজা খাতুন বলেন, রাতে মোবাইল ফোনে ছায়ানটে হামলার ভিডিও দেখার সময় পাশে বসা তাঁর ছেলে বলছিল, “মা চলো—আমাদের স্কুল ভেঙে ফেলতেছে।” সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, রাতে যখন হামলার আশঙ্কা করছিলেন, তখন ধানমন্ডি থানার ওসিকে একাধিকবার ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ফোন ধরেননি।
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর রাজধানীর শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় রাত ১টার পর একদল বিক্ষোভকারী ধানমন্ডির শংকরে অবস্থিত ছায়ানট ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা থেকে আড়াইটার মাঝামাঝি সময়ে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে এসে সাততলা ভবনটিতে হামলা চালায়। তারা প্রথমে পার্কিং লটের দিকে আগুন দেয়, পরে দরজা ভেঙে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। নিচতলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন তলায় ঘুরে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।
হামলার সময় ‘ভারতের দালাল’, ‘ভুয়া’, ‘নারায়ে তাকবীর’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘ভাঙো’—এমন নানা স্লোগান দেওয়া হয়। প্রয়াত সন্জীদা খাতুনের প্রতিকৃতি কেটে নষ্ট করার সময় তাঁকে ‘নাস্তিক’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
মিলনায়তনসহ ভবনের বিভিন্ন স্থানে যা পেয়েছে, তাই ভাঙচুর করেছে হামলাকারীরা। তবলা, হারমোনিয়াম, তানপুরা সহ অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনতলার একটি অংশে পুড়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে স্তুপ করে রাখা ছিল পুড়ে যাওয়া বই। পুরো মনিটরিং সিস্টেম, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পিকার, লাইট ও ফ্যান ভেঙে ফেলা হয়। মাটির তৈরি চারুকর্ম ও বিভিন্ন শিল্পকর্মও রেহাই পায়নি।
প্রতিটি তলায় থাকা সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও সেখানে পরিচালিত বিদ্যালয়ের কক্ষ ও অফিস রুমের বেশিরভাগ আসবাবপত্র ভেঙে তছনছ করা হয়। কাগজপত্র ও সরঞ্জাম ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষেও ভাঙচুর চালানো হয়; আলমারির গ্লাস ভাঙা হয়, চেয়ার-টেবিল ওলটপালট করা হয়। রমেশ চন্দ্র স্মৃতি মিলনায়তন, মূল মিলনায়তন এমনকি শৌচাগারও এই তাণ্ডব থেকে বাদ যায়নি।
সকাল হতেই আফরোজা খাতুনের মতো আরও অনেক অভিভাবক ছায়ানট ভবনের সামনে এসে জড়ো হন। কেউ কেউ সন্তানদের সঙ্গেও নিয়ে আসেন। শংকরের বাসিন্দা দীপান্বিতা রায় ও সুশান্ত রায়ের মেয়ে অপরাজিতা রায় ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী। তারা জানান, হামলার খবর শুনে সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। হাদির মৃত্যুর সঙ্গে ছায়ানটের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
সুশান্ত রায় বলেন, হাদিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কেউই সমর্থন করে না এবং সবাই এই হত্যার বিচার চান। কিন্তু ছায়ানটে হামলাকারীরা হাদির চেতনাকে ধারণ করে কি না—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, রাতে যে তাণ্ডব চলেছে, তা থামাতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হামলাকারীদের একটি অংশ লুটপাটে জড়িত ছিল। তারা বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার ভেঙে টাকা-পয়সার খোঁজ করেছে। কেউ কেউ বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে।
ধানমন্ডি থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা মিথুন সিংহ জানান, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার কিছু পরেই ছায়ানট ভবনে হামলা শুরু হয়। রাত আড়াইটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেন। তার আগেই হামলাকারীদের তাণ্ডবে দেশের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হামলার পর ছায়ানট ভবনে পরিচালিত ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের ক্লাসসহ সংগঠনের সব কার্যক্রম পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাত সাড়ে তিনটার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৯৬১ সালে বাঙালিকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও দেশীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানি শাসকদের বাধা উপেক্ষা করে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপনের সূত্র ধরেই এর যাত্রা শুরু। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে রমনা বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজনের মাধ্যমে সংগঠনটি পরিচিতি পায়।
এর আগেও প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছে ছায়ানট। ২০০১ সালে বর্ষবরণের সেই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ভয়াবহ বোমা হামলার মুখে পড়ে; এতে ১০ জনের প্রাণ যায় এবং অনেকে আহত হন। তবু সাংস্কৃতিক পুরোধা ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে দমে না গিয়ে এগিয়ে গেছে সংগঠনটি।
সাম্প্রতিক হামলার পরও ছায়ানটের সদস্য, শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন—এই আঘাতেও তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেমে থাকবে না।
