বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভারতীয় কূটনীতিকের সাথে বৈঠক ও রাজনৈতিক অবস্থান

এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান গত বছর (২০২৫) তাঁর বাইপাস সার্জারির পর একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সাথে বৈঠক করেছিলেন। বুধবার নিজ বাসভবনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, অন্য অনেক দেশের কূটনীতিকরা প্রকাশ্যে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেও ভারতীয় ওই কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। শফিকুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের সবার কাছে এবং একে অপরের কাছে উন্মুক্ত হতে হবে। আমাদের সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।” ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারতীয় সরকারের এক সূত্র বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জামায়াতের ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সবার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কখনো কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে আগ্রহী নই।” তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা থেকে পালিয়ে তার ভারতে ধারাবাহিক অবস্থান একটি উদ্বেগের বিষয়, কেননা এটি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম শক্তি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

রাজনৈতিক প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামী আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে চলেছে এবং একটি ‘ঐক্যের সরকার’-এ যোগদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দলটির প্রধান জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলেছে। জনমত জরিপ অনুসারে, প্রায় ১৭ বছর পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেয়া জামায়াত প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জামায়াত সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে ক্ষমতায় ছিল।

জেন-জিদের দলের (এনসিপি) সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার কয়েক দিন পর দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান ঐক্যের সরকার বিষয়ে বলেন, “আমরা অন্তত পাঁচ বছর দেশকে স্থিতিশীল দেখতে চাই। দলগুলো যদি এক জায়গায় আসে, তাহলে আমরা একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কোনো ঐক্যের সরকারের জন্য দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান একটি অভিন্ন এজেন্ডা হবে এবং যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, সেই দল থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। যদি জামায়াত সর্বাধিক আসন পায়, তবে তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন কিনা সে সিদ্ধান্ত দলই নেবে বলে তিনি জানান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর এই রাজনৈতিক উত্থান গত বছর আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ঘটেছে। হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। হাসিনা জামায়াতের কঠোর সমালোচক ছিলেন এবং তার শাসনামলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আদালতের এক রায়ের পর ২০১৩ সাল থেকে দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দলটির ওপর থেকে এই বিধিনিষেধ তুলে নেয়।

সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতকে নিয়ে গঠিত কোনো সরকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে ‘স্বস্তি বোধ’ করবে না। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। চলতি মাসের শুরুর দিকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন রয়টার্সকে বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়েই পদত্যাগ করতে চান। তবে বুধবার টেলিফোনে আলাপচারিতায় জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তিনি ‘এ বিষয়টিকে আর জটিল’ করতে চান না।