মনোনয়ন বাছাইয়ে ঝরছে পরিচিত মুখ, আপিলের অপেক্ষায় প্রার্থীরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে জমা পড়া মনোনয়নপত্রের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া রোববার শেষ হচ্ছে। এরই মধ্যে রাজনীতির পরিচিত মুখ ও বিভিন্ন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দলীয় প্রত্যয়ন সঠিক না হওয়া, হলফনামার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজ সংযুক্ত ও স্বাক্ষর না করা, ঋণখেলাপি থাকা, মামলার তথ্য গোপন করা, প্রার্থীর স্বাক্ষর না থাকা এবং সমর্থন তালিকার ত্রুটির কারণে অনেক মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

রিটার্নিং অফিসারের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ পাচ্ছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। আগামী ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে এসব আপিল নিষ্পত্তি করা হবে।
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন, আলোচনায় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিরবিদায়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূচিত নতুন অধ্যায়ের এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ফলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। একই সঙ্গে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে থাকা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছেন।

এই তিন দলের প্রধানদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলেও জাতীয় পার্টি থেকে বেরিয়ে একই নামে নতুন দল গঠন করা আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

পরিচিত মুখদের মনোনয়ন বাতিল ও বৈধতার চিত্র
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র এক আসনে বাতিল হলেও অন্য আসনে বৈধ হয়েছে। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাওয়া তাসনিম জারার মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।

বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে বড় দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার ও ৫০০ সহকারী রিটার্নিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে ৩০০ আসনে আড়াই হাজারের বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে, যার মধ্যে ৪৭৮ জন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

‘মব করে’ মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ
বগুড়া-২ আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না অভিযোগ করেছেন, ‘মব করে’ তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

বাদ পড়ার রকমফের
রিটার্নিং অফিসাররা যে কারণগুলো দেখিয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল করছেন, তার মধ্যে রয়েছে—
দলীয় প্রত্যয়ন সঠিক না হওয়া
হলফনামায় প্রয়োজনীয় কাগজ সংযুক্ত ও স্বাক্ষর না করা
ঋণখেলাপি থাকা
মামলার তথ্য না দেওয়া
মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর স্বাক্ষর না থাকা
১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন তালিকার সঠিকতা না থাকা
ঢাকা-১৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি এ আসনের ১ শতাংশ ভোটার, অর্থাৎ ৪ হাজার ৮৮ জনের স্বাক্ষরসংবলিত সমর্থন তালিকা জমা দেন। দৈবচয়নের মাধ্যমে বাছাই করা ১০ জন ভোটারের মধ্যে পাঁচজনের তথ্য সঠিক পাওয়া গেলেও দুজন স্বাক্ষর করার কথা অস্বীকার করেন। একজনের স্বাক্ষর অন্য ব্যক্তির বলে শনাক্ত হয় এবং আরেকজন স্বাক্ষর অস্বীকার করেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসরণ না হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এই আদেশের সার্টিফাইড কপি মনোনয়নপ্রত্যাশীকে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

তাসনিম জারার মনোনয়ন বাতিল
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাওয়া তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ভোটার নন—এমন ব্যক্তির স্বাক্ষর পাওয়া যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে তাসনিম জারা বলেন, যাচাই করা ১০ জনের মধ্যে আটজন স্বাক্ষরের কথা স্বীকার করেছেন, একজনকে পাওয়া যায়নি এবং আরেকজন নিজেকে ওই এলাকার ভোটার নন বলে জানিয়েছেন। তিনি আপিল করার প্রস্তুতির কথাও জানান।

সিপিবির মনোনয়ন ও দলীয় প্রত্যয়ন জটিলতা
কুমিল্লা-৫ আসনে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফীর এবং ঢাকা-১৫ আসনে দলটির আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেলের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। দলীয় প্রত্যয়ন সঠিক না হওয়াকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রতন বলেন, নির্বাচন কমিশনের কমিটি সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তার দাবি, কমিশনের গাফলতির কারণে অনেক প্রার্থী ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং তাদের আপিল করতে হবে।

জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের মনোনয়ন পরিস্থিতি
রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলেও চট্টগ্রাম-৫ আসনে জাতীয় পার্টির আরেক অংশের নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র স্বাক্ষর গরমিলের কারণে বাতিল করা হয়েছে।

কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র মামলা সংক্রান্ত তথ্যের গরমিলের কারণে বাতিল হয়। তার আইনজীবীর দাবি, মামলাটি পুরোনো এবং আপিল বিচারাধীন।

ঢাকা-২ আসনে ঋণখেলাপি থাকার কারণে জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকায় মনোনয়ন বাছাইয়ের সারসংক্ষেপ
ঢাকা মহানগরের ১৩টি আসনে যাচাই শেষে ১১৯টি মনোনয়নপত্র বৈধ, ৫৪টি বাতিল এবং একটি স্থগিত রাখা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি।

নির্বাচনের সময়সূচি
মনোনয়নপত্র বাছাই: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ – ৪ জানুয়ারি ২০২৬
আপিল দায়ের: ৫ – ৯ জানুয়ারি ২০২৬
আপিল নিষ্পত্তি: ১০ – ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
প্রার্থিতা প্রত্যাহার: ২০ জানুয়ারি ২০২৬
ভোটগ্রহণ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা)