৫ম বার এমপি নির্বাচিত বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী : মন্ত্রী হিসেবে দেখার প্রত্যাশায় সীমান্ত জনপদ

সকাল থেকে দলে দলে কেন্দ্রে ছুটে আসেন নারী-পুরুষ ভোটার। প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণদের উচ্ছ্বাস আর সার্বিক উৎসবমুখর পরিবেশে বৃহস্পতিবার এক ভিন্ন রূপে দেখা যায় সীমান্ত জনপদ উখিয়া-টেকনাফকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৪ আসনে ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রায় দেড় দশক পর আবারও ধানের শীষ প্রতীকে জয় পেয়েছেন সাবেক হুইপ ও কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী।

বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের ১১৬টি কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৮ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ২৩১টি, যা মোট ভোটারের ৬৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। কাস্ট হওয়া ভোটের মধ্যে বৈধ ভোট ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৩২টি এবং বাতিল হয়েছে ৪ হাজার ৮৯৯টি ভোট।

ধানের শীষ প্রতীকে শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৮২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের নুর আহমদ আনোয়ারী পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৩৩ ভোট। মাত্র ১ হাজার ৫৪৯ ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন শাহজাহান চৌধুরী। অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে হাতপাখা প্রতীকের নুরুল হক পেয়েছেন ৪ হাজার ৩৩৮ ভোট এবং সিংহ প্রতীকের সাইফুদ্দিন খালেদ পেয়েছেন ৩৭৯ ভোট।

ভোটারদের মতে, দীর্ঘ ২২ বছর হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অর্জিত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নুর আহমদ আনোয়ারী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন।

নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই কুয়াশা আর শীত উপেক্ষা করে উখিয়ার হলদিয়াপালং থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত প্রতিটি কেন্দ্রে দেখা যায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে নারী ভোটারদের উপস্থিতি। অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক নারী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে আসেন। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তায় ‘ভয়হীন’ পরিবেশে পর্দানশীন নারীরাও দলবেঁধে কেন্দ্রে আসেন।

প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটাররাও ছিলেন বেশ উৎসাহী। তারা শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচনেই নয়, গণভোটেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ফলে অনেক কেন্দ্রেই তরুণদের উপস্থিতিতে নির্বাচন এক উৎসবমুখর পরিবেশ পায়।

উখিয়া উপজেলার পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা তরুণ মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরে ভালো লেগেছে। তিনি জানান, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায় গণভোটেও ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন।

একইভাবে উখিয়ার মৌলভী পাড়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা তরুণী হাফসা সুলতানা বলেন, জীবনে প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এমন একটি সরকার আসুক, যারা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে।

নির্বাচন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল শান্তিপূর্ণ। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের যৌথ টহলে কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল দৃশ্যমান।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা রিফাত আসমা বলেন, উখিয়া-টেকনাফে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হওয়ার পর শাহজাহান চৌধুরী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি জয়লাভ করেছেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, এই জয় পুরো এলাকার মানুষের জয়, তিনি কোনো বিভেদ চান না; সবার উন্নয়নই হবে তার মূল লক্ষ্য।

অন্যদিকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত নুর আহমদ আনোয়ারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ঘোষিত ফলাফলে অসংগতি রয়েছে বলে তার অভিযোগ। বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি তিনি এলাকায় প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সম্প্রীতির রাজনীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

শাহজাহান চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য। ১৯৭৭ সালে রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে তার পথচলা শুরু। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৮ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময়ে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি ও দায়িত্বেও তিনি ছিলেন।

২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবারও আসনটি ফিরে পেয়েছেন তিনি।

এদিকে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেক ভোটারের দাবি, পাঁচবারের অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য হিসেবে শাহজাহান চৌধুরীকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তারা। তাদের আশা, মাদক সমস্যা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখবেন এবং উখিয়া-টেকনাফের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবেন।