নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান কৌঁসুলির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
সোমবার দায়িত্ব হারানোর পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং বিদায়ের অনুভূতি তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।
কথার শুরুতেই নতুন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলামকে স্বাগত জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে—আমি নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে স্বাগত জানাই। তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা থাকবে। তিনি যেন আমাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করতে পারেন।” জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং গত ১৫ বছরের গুম-খুনের অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া নতুন নেতৃত্বের অধীনে অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
পদচ্যুতির বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া একটি স্বাভাবিক নিয়ম। “এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যখনই একটি নির্বাচিত সরকার আসে, তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিস্থাপন করে,” বলেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর সময়কার পরিস্থিতি স্মরণ করে তাজুল ইসলাম জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে তিনি অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্যে দায়িত্ব নেন। তখন ট্রাইব্যুনালের মূল ভবন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। আগের প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা চলে যাওয়ার পর নথিপত্র এলোমেলো পড়ে ছিল, কিছু কাগজপত্র বৃষ্টিতে ভিজছিল। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই তারা কাজ শুরু করেন।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের কাছ থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয় এবং গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন এবং কার্যক্রম সচল রাখতে সহযোগিতার জন্য তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী, শহীদ পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, শুরুতে সরকার থেকে বলা হয়েছিল তারা দায়িত্বে বহাল থাকবেন। তবে সম্প্রতি আইনমন্ত্রী তাকে জানান, সরকার নতুন কাউকে এ পদে নিয়োগ দিতে চায়। তিনি নিজে পদত্যাগের প্রস্তাব দিলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেটির প্রয়োজন নেই; প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতেই পরিবর্তন আনা হবে। পদত্যাগ করলে ভিন্ন বার্তা যেতে পারত বলেও তাকে জানানো হয়।
মামলায় আসামি বাছাই নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে শীর্ষ কমান্ডার ও সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। “বিশ্বের ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কোথাও হাজার হাজার সৈন্যকে শাস্তি দেওয়ার নজির নেই। সেখানে মূলত শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশদাতা এবং সরাসরি জড়িতদেরই বিচারের আওতায় আনা হয়,” ব্যাখ্যা করেন তিনি।
নিজের মেয়াদকালে দেওয়া রায় ও উপস্থাপিত প্রমাণের মান নিয়ে শতভাগ আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন তাজুল ইসলাম। তার ভাষায়, “যে রায় হয়েছে এবং যে ডকুমেন্ট আমরা উপস্থাপন করেছি—উচ্চ আদালতে গিয়ে তা উল্টে যাওয়ার সুযোগ নেই।” তিনি দাবি করেন, অতীতের ট্রাইব্যুনালের রেকর্ড ঘেঁটে দেখলেও তাদের মতো শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপনের নজির খুব কম পাওয়া যাবে।
গত দেড় বছরে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যেন আর কখনো গুম, হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে—এই আশা প্রকাশ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাজুল ইসলাম বলেন, তার মূল পরিচয় তিনি একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তাই তিনি আবার স্বাভাবিক আইন পেশায় ফিরে যাবেন। “আমি একদিনের জন্যও বেকার থাকছি না। আপাতত কোনো নতুন পদে যাচ্ছি না,” বলেন তিনি।
