অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কঠিন সময় পার করার কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তাকে অপসারণের চেষ্টা চালিয়েছে, বিদেশ সফর আটকেছে, কূটনৈতিক মিশন থেকে তার ছবি নামিয়ে দিয়েছে এবং তার প্রেস উইং পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। সোমবার পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে।
‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অবিচল ছিলাম’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
হাসিনা আমলের সবকিছু বিলীন হয়ে গেলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বঙ্গভবনে থেকে যান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারকেও শপথ পড়ান তিনিই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয়েছে দাবি করে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।
“আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।”
‘বিভীষিকাময় রাত’ বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয়। সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাহাবুদ্দিন বলেন, “ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল।”
ওই সময় এক নারীর ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া। তারপর যখন সাউন্ড গ্রেনেড মারা হলো, লাফ দিয়ে পড়ল। পড়ার পর সে পড়েই থাকবে, ছবি তোলা হবে। সে ডাকছে ক্যামেরাম্যানকে যে ছবি তোলো, ছবি তোলো।”
তিনি জানান, সেনাবাহিনী তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে এবং সাঁজোয়া যান দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। রাত ১২টায় তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানান, এ ঘটনায় জড়িতরা তাদের লোক নয়।
‘দুঃসময়ে বিএনপির সমর্থন শতভাগ ছিল’
রাষ্ট্রপতি জানান, তার পদত্যাগ দাবির সেই কঠিন সময়ে বিএনপি তার পাশে ছিল। তিনি বলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।”
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”
বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণের পক্ষে তারা নয়। তিনি মনে করেন, বিএনপি ও তাদের জোটের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তাকে অপসারণের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
‘সশস্ত্র বাহিনী ছিল পাশে’
তিন বাহিনীর সমর্থনের কথাও জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’ শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিন বাহিনীর প্রধানরা তার পক্ষে অবস্থান নেন এবং প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়ে দেন যে কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তারা হতে দেবেন না।
‘সাবেক প্রধান বিচারপতিকে এনে বসানোর চক্রান্ত’
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এনে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “একটা অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানোর চক্রান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই মুভটা হয়েছে।”
তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী মিটিং করেন। তবে ওই বিচারপতি রাজি হননি। তিনি সাফ বলে দিয়েছিলেন, ‘উনি রাষ্ট্রপতি, উনি সবার ঊর্ধ্বে সাংবিধানিকভাবে, সবকিছুর ওপরে। ওই জায়গায় আমি অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না।’ ওই বিচারপতির দৃঢ়তার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের ওই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।
‘প্রধান উপদেষ্টা একবারও আমার কাছে আসেননি’
রাষ্ট্রপতি জানান, ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর একবারও তার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। সংবিধান অনুযায়ী বিদেশ সফর থেকে ফিরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে সফরের ফলাফল জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি তা পালন করেননি।
“প্রধান উপদেষ্টা বোধহয় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। একবারও আমাকে জানান নাই। একবারও আমার কাছে আসেননি,” বলেন তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তি সম্পর্কেও তাকে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি।
‘বিদেশ সফর আটকানো হয়েছে’
রাষ্ট্রপতি জানান, তার দুইবার বিদেশ সফর আটকে দেওয়া হয়েছে। কাতারের আমির তাকে একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত দিলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ‘রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত’ জানিয়ে একটি চিঠি বানিয়ে সই করতে দেয়।
তিনি বলেন, “একজন রাষ্ট্রপতি কি এত বেশি ব্যস্ত থাকে, আমাদের সংবিধানের আলোকে? যাই হোক, পরে আমি ওই চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে পাল্টা একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। তাতে আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই।”
‘এক রাতে সব মিশন থেকে ছবি নামানো হলো’
অপমানের আরেকটি ঘটনা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, একদিন একজন উপদেষ্টা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে বাংলাদেশ হাই কমিশনে তার ছবি দেখে ক্ষিপ্ত হন এবং সেটি রাখার কারণ জানতে চান। এরপর এক রাতের মধ্যে সারা বিশ্বের সব বাংলাদেশ মিশন থেকে তার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়।
“দীর্ঘদিনের একটা রেওয়াজ রাতারাতি শেষ করে দেওয়া হলো। ওই ঘটনাটি গণমাধ্যমে এলে আমি জানতে পারি,” বলেন তিনি।
‘প্রেস উইং একদম নিল করে দিল’
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে তার সাক্ষাতের খবর পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এর জেরে বঙ্গভবনের পুরো প্রেস উইং প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
“প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারি—তিনজনকেই নিয়ে গেল। এমনকি দুজন ফটোগ্রাফার ছিল, যারা ৩০ বছর এখানে কাজ করছিল, তাদেরও প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল। প্রেস উইং একদম নিল করে দিল।
“আমরা এখান থেকে কোনো প্রেস রিলিজ দিতে পারি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম কোথাও জিতলে অভিনন্দন জানিয়ে যে একটা প্রেস রিলিজ দেব, সেটাও পারি না। একদম প্রতিবন্ধী করে দিল,” বলেন তিনি।
‘রক্ত ঝরবে, কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব’
সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব—আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার মূল পরিচয় আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। সুতরাং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষে আমার জায়গা হচ্ছে আইন পেশায় ফিরে যাওয়া।”
