নিজস্ব পরিবেশক
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিটের পরবর্তী আইনি ধাপেও স্বস্তি পেল না রিটকারী পক্ষ। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে করা লিভ টু আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ফলে আপাতত আদালতের এই পর্যায়ে রিটটি এগোয়নি।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। এর ফলে হাইকোর্টের আগের সিদ্ধান্তই বহাল থাকল। তবে রিটকারীদের আইনজীবীরা বলছেন, আইনি লড়াই এখানেই শেষ হয়ে যায়নি; সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে তারা আবারও আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
রিটকারীর পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম জানান, সরকার যদি সত্যিই বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে আপিল বিভাগের আদেশের বিরুদ্ধে ‘রিভিউ’ আবেদন করার সম্ভাবনা রয়েছে। তার ভাষ্য, বিষয়টি এখন অনেকটাই সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে জারি করা রুল খারিজ করে দেন। বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চ ওই রায় দেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়, যা আপিল বিভাগ গ্রহণ করেনি।
আদালতে রিটকারীর পক্ষে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন শুনানি করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
এই মামলার শুরুতে হাইকোর্টে রুল জারির পর বেঞ্চে ভিন্নমত দেখা দেয়। একজন বিচারপতি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল পরিচালনার প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে মত দেন, অন্য বিচারপতি সেটিকে বৈধ ঘোষণা করে রিট খারিজ করেন। পরে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য একক বেঞ্চে পাঠানো হয় এবং সেখানে রিটটি খারিজ হয়ে যায়।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো। এ টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানিকে যুক্ত করার পরিকল্পনা ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া থাকা উচিত।
রিটে মূলত এই যুক্তিই তুলে ধরা হয়েছিল—কেন সরাসরি চুক্তির পথে এগোনো হবে এবং কেন আন্তর্জাতিক মানের পাবলিক বিডিং করা হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই সিদ্ধান্তে আপাতত সরকারের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার পথ কিছুটা সহজ হলো। তবে যদি সরকার বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করে, তাহলে বিষয়টি আবার আদালতে ফিরে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বন্দর খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার হওয়ায় এখানে যে কোনো ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে দেশের বাণিজ্য ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চুক্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষ থেকে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন এই রিট দায়ের করেন। এতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়।
রিটে দাবি করা হয়, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আগে আইন অনুযায়ী স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা উচিত। এই দাবি ঘিরেই শুরু হয় আইনি লড়াই, যা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
