নিজস্ব পরিবেশক
গুম, হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ১৫ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তার মামলার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আসামিপক্ষ। তাদের দাবি, এসব কর্মকর্তার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নয়; বরং সেনাবাহিনীর নিজস্ব আইন আর্মি অ্যাক্ট ১৯৫২ অনুযায়ী হওয়াই আইনসম্মত।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী এবিএম হামিদুল মিসবাহ বলেন, কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি সামরিক আইনের অধীনেই বিচারযোগ্য। তার মতে, বিদ্যমান সেনা আইন থাকা সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনালের আইনের সংশোধনের মাধ্যমে এই বিচার শুরু করা হয়েছে, যা আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইনজীবীর দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে বিচারিক এখতিয়ার রয়েছে, তার মধ্যে এই মামলাগুলো পড়ে না। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা ঘটনার সময়ও সেনাবাহিনীর সক্রিয় কর্মকর্তা ছিলেন এবং এখনও কর্মরত আছেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সামরিক আইন অনুযায়ী বিচারযোগ্য।
তার ভাষ্য, গুম বা হত্যার অভিযোগকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে দেখাতে হলে আন্তর্জাতিক আইনের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। কিন্তু বর্তমান মামলাগুলোর ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আসামিপক্ষের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, সেগুলো মূলত এই ধরনের মামলাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে।
আইনজীবী মিসবাহ বলেন, ফৌজদারি আইনে সাধারণত কোনো আইনকে অতীত ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হয় না। কিন্তু এখানে আইনের সংশোধনের মাধ্যমে সেই সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, এটি সংবিধানসম্মত ন্যায্য বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ডিজিএফআই, র্যাব ও বিজিবিতে কর্মরত মোট ১৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এর মধ্যে দুটি মামলায় গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে, আরেকটি মামলায় জুলাই–আগস্ট সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেছে এবং কিছু সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে পর্যায়ক্রমে ২৯ মার্চ, ৩১ মার্চ এবং ৭ এপ্রিল।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মামলাগুলোতে নতুন করে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, একদিকে পুনঃতদন্তের কথা বলা হলেও অন্যদিকে সাক্ষ্যগ্রহণ চলতে থাকা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
তারা আরও দাবি করেন, অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আদালতে হাজির হয়েছেন। তবে যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়, সেটির বিচার সামরিক আইনের আওতায় হওয়াই যুক্তিসঙ্গত।
আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেনা কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় র্যাব, ডিবি বা গোয়েন্দা সংস্থায় প্রেষণে কাজ করলেও তাদের মূল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে সেনাবাহিনীর অধীনে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার সামরিক আইনের মাধ্যমে করা হলে সেটি প্রশাসনিকভাবে আরও সঙ্গতিপূর্ণ হবে বলে তারা মনে করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিতর্ক তৈরি করতে পারে—সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে তা সামরিক আদালতে হবে, নাকি বেসামরিক বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হবে।
যদি ট্রাইব্যুনাল তার এখতিয়ার বজায় রাখে, তাহলে এটি ভবিষ্যতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ বিচার করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে সামরিক আইনের পক্ষে যুক্তি জোরালো হলে বিচারব্যবস্থার কাঠামো নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
