ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব: তথ্যমন্ত্রী

রাষ্ট্র পরিচালনায় সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও তার ধারাবাহিক চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ কনফারেন্স সেন্টারে আয়োজিত ‘ফিরে দেখা সেই সময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বইটি রচনা করেছেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, একটি রাষ্ট্রের সঠিক অগ্রযাত্রা নির্ভর করে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর। ইতিহাসকে শুধু স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না রেখে তা লিপিবদ্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘ফিরে দেখা সেই সময়’ গ্রন্থে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা দেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

মন্ত্রী তার বক্তব্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একতরফা হিসেবে অভিহিত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং উল্লেখ করেন, ওই নির্বাচনে ১৫১টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। জনগণের বড় অংশ অংশগ্রহণ না করলে একটি নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে—সে প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ‘নিশিরাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ওই সময় তিনি নিজেও প্রার্থী ছিলেন এবং প্রায় এক মাস দশ দিন নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকার অভিযোগ করেন। এ সময় বাসার সামনে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান, রাতে অভিযান এবং রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রধান বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ না থাকায় একটি সীমিত প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। নিজ দলের ভেতর থেকে প্রার্থী দাঁড় করানোর চেষ্টা থাকলেও বিপুল সংখ্যক ভোটার ভোটদানে অংশ নেয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না এবং জনগণ শেষ পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও তিনি এর প্রতিফলন দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী।

তরুণদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। অন্ধভাবে কিছু গ্রহণ না করে বিশ্লেষণধর্মী ও যুক্তিনির্ভর চিন্তার চর্চা প্রয়োজন। এতে একটি সচেতন ও গতিশীল সমাজ গড়ে ওঠে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এর সাংবিধানিক অবস্থান নির্ধারিত নয়। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। অতীত অভিজ্ঞতা ও জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বইটির প্রকাশক সৈয়দ আবদাল আহমদ। এছাড়া বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান এবং বাংলাভিশন টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ও হেড অব নিউজ ড. আবদুল হাই সিদ্দিক।

বইটির লেখক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ তার বক্তব্যে বলেন, অতীত সময়ে রাজনৈতিক পরিসরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও জনগণের অধিকার সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে জনগণের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত হয়ে পড়েছিল।

তিনি আরও বলেন, সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সেই চর্চা সবসময় প্রতিফলিত হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গ্রন্থটিতে মোট ৩৮টি নিবন্ধ সংকলিত হয়েছে, যেখানে নির্বাচন ব্যবস্থা, গুম-খুন, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অনিয়ম, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক চর্চার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।