দাম নিয়ে তর্ক থেকে সংঘর্ষ: রাবিতে ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে দোকানি লাঞ্ছনার অভিযোগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফটোকপির বিল পরিশোধকে ঘিরে তর্কাতর্কি থেকে এক দোকানি ও তার কর্মচারীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট এক নেতার বিরুদ্ধে। রোববার (৫ এপ্রিল) রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট এলাকায় অবস্থিত ‘হিমেল কম্পিউটার স্টেশনারী’ নামের একটি দোকানে এ ঘটনা ঘটে।

অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল কাফি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাফি তার এক আত্মীয়ের সার্টিফিকেট সংগ্রহের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফটোকপি করতে ওই দোকানে যান। কাজ শেষ হলে দোকান কর্তৃপক্ষ মোট খরচ ২৮০ টাকা বলে জানায়। তবে কাফি ওই মূল্যকে বেশি দাবি করে ২২০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে প্রথমে কথাকাটাকাটি শুরু হয়, যা পরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে দোকানদার প্রিন্ট করা কাগজ সরিয়ে দেন এবং কম্পিউটার বন্ধ করে দেন। এর জেরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পরে কাফি ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন দোকানে প্রবেশ করে দোকানদারকে মারধর করেন এবং দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। এতে দোকানের ভেতরে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং আশপাশের ব্যবসায়ীরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

অভিযুক্ত কাফি অবশ্য ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, দোকান কর্তৃপক্ষ ফটোকপির জন্য অস্বাভাবিক দাম দাবি করছিল, তাই তিনি স্বাভাবিক দরেই মূল্য পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন,“আমি কেবল সঠিক দামে কাজটি করতে চেয়েছি। কিন্তু দোকানদার আচমকা আমার কাগজ ছুড়ে ফেলে দেন এবং তাদের কর্মচারী আমাদের সঙ্গে অশালীন ভাষায় কথা বলেন। একপর্যায়ে তারা আমাদের ওপর চড়াও হলে ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে বাইরের কারও কাছ থেকে এমন আচরণ তার কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে।

অন্যদিকে, অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ—কাগজ ছুড়ে ফেলে দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছেন দোকানদার। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ফটোকপির মোট বিল ছিল ২৮০ টাকা, কিন্তু কাফি ২০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত তিনি ২৫০ টাকায় সমঝোতার চেষ্টা করেন, তবুও কাফি তা মানেননি।

দোকানদার বলেন,“দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে যাওয়ায় আমি তাকে বলেছিলাম—আপনি চাইলে আশেপাশের অন্য দোকানে যাচাই করতে পারেন। এরপর আমি কম্পিউটার বন্ধ করলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং বলেন—আপনার দোকানই বন্ধ করে দেব।”

তার দাবি, এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তিনি হামলার শিকার হন।

ঘটনার পরপরই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ঘটনাস্থলে যান এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি বলেন, উভয় পক্ষই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে।

প্রক্টর আরও বলেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বজায় রাখতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে ঘটনার পর ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সামান্য একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া দুঃখজনক। আবার অনেকে বলছেন, ক্যাম্পাসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা ও মূল্য নির্ধারণেও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট এলাকায় প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে আসেন। ফটোকপি, প্রিন্টিং, স্টেশনারি সামগ্রী কেনাসহ নানা কাজে এসব দোকানের ওপর নির্ভরশীল তারা। ফলে এ ধরনের ঘটনায় একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও অস্বস্তিতে পড়েন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতি এড়াতে পারস্পরিক সহনশীলতা, পরিষ্কার মূল্য তালিকা এবং দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি। অন্যথায় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকেও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।