গভীর রাতে হল তল্লাশি বিতর্ক, রাবি জিয়া হলে ৩ নেতার আবাসিকতা স্থগিত

গভীর রাতে ‘নারী অবস্থান করছে’ এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলে তল্লাশি চালানোর ঘটনায় প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে হল সংসদের তিন নেতার আবাসিকতা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং আরও একজন নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ১২১ নম্বর কক্ষে। অভিযোগ উঠেছে, হল সংসদের কয়েকজন নেতা ‘নারী অবস্থানের সন্দেহ’ তুলে ভোররাতে কক্ষে প্রবেশ করে তল্লাশি চালান। তবে তল্লাশির পর কক্ষটিতে কোনো নারীর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার গভীর রাতে প্রায় ভোর ৪টার দিকে হল সংসদের কয়েকজন নেতা ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। অভিযোগ ছিল, সেখানে অননুমোদিতভাবে কোনো নারী অবস্থান করছেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে তারা কক্ষে তল্লাশি চালান বলে জানা যায়। পরে ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়।

ঘটনার পরদিনই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে হল কর্তৃপক্ষ। বিকেলে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হল প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় প্রথমে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং উপস্থিত কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে। ফলে বৈঠক সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়।

পরবর্তীতে রাতের দিকে আবারও আলোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর হল প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় যে, অভিযুক্ত তিনজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাতভর আলোচনার শেষে তাদের আবাসিকতা সাময়িকভাবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা হলেন—হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মো. ইসরাফিল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. সাকিব জুবায়ের এবং আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ফোরকান হাফিজ জীম। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।

হল প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে যে, নারী অবস্থানের যে অভিযোগ তুলে তল্লাশি চালানো হয়েছিল, তা সত্যতার প্রমাণ পায়নি। অর্থাৎ অভিযোগটি ভিত্তিহীন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিন শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

এছাড়া একই ঘটনায় হল সংসদের ভিপি মোজাম্মেল হককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কমিটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনা আবাসিক হলের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে গভীর রাতে অনুমতি ছাড়া কক্ষে প্রবেশ এবং তল্লাশির বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা হলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তবে প্রশাসনের মতে, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে হলেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কক্ষে প্রবেশ করা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এদিকে ঘটনার পর ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করলেও অন্য অংশ বিষয়টি নিয়ে আরও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, আবাসিক হলগুলোতে নিয়মনীতি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই প্রশাসনিক চ্যানেলের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত, সরাসরি তল্লাশি বা বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়।

সব মিলিয়ে এই ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।