আজ জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার পেছনের কারণ হিসেবে আগের সরকারের নীতিগত ত্রুটি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল নীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিগত দেড় দশকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নানা অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি সংসদের মাধ্যমে এসব সূচকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে জানান, এক সময় যেখানে প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক অবস্থানে ছিল এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে তিনি উল্লেখ করেন, শিল্প ও কৃষি—উভয় খাতেই প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। শিল্প খাত, যা সাধারণত অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত, সেখানে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। একইভাবে কৃষিতেও প্রবৃদ্ধি কমে আসায় সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় প্রভাব পড়েছে।
কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, শিল্প ও সেবা খাতে প্রত্যাশিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় অনেক তরুণ বাধ্য হয়ে কৃষিখাতে যুক্ত হচ্ছে, যা ছদ্ম-বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। এতে শ্রমশক্তির কার্যকর ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, অতীতে এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা মেটাতে বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে।
মুদ্রাবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে অবমূল্যায়িত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার এই পতনের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পূর্ববর্তী সময়ে বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন ও যথাযথ যাচাইয়ের ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও উঠে এসেছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, উপকারভোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয় করা হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রত্যাশিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং বৈষম্য বেড়েছে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুশাসন ও কার্যকর সংস্কারের ওপর জোর দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যে দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
