সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে আইনি লড়াই, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা স্থগিত

সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত রেখেছে আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের করা আপিলের শুনানির জন্য আগামী ১৬ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে। তবে আপিল বিভাগের এই আদেশের আগে সচিবালয় বিলুপ্ত করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন মামলার রিটকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।

শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার সরকারি উদ্যোগ আদালতের আদেশের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার ভাষায়, হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় সচিবালয় বিলুপ্তির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আদালতের নির্দেশনার প্রতি উপেক্ষার শামিল বলে প্রতীয়মান হয়।

শিশির মনির বলেন, আপিল বিভাগের দ্রুত শুনানির মাধ্যমেই এ বিতর্কের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তবে স্থগিতাদেশ জারি হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকার যে তড়িঘড়ি করে সচিবালয় বিলুপ্তির উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি না করলেও পারত।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে আদালতের রায় অমান্য করলেও কোনো সমস্যা হয় না, যা রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।

আইনজীবী শিশির মনির দাবি করেন, ১৯ মে ২০২৬ তারিখ থেকে সচিবালয়ের সচিবসহ ১৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্ব পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্তও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তবে আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশের পর সরকার ভবিষ্যতে আইনি কাঠামোর মধ্যেই পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শুনানিতে তিনি আরও যুক্তি তুলে ধরেন যে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। দেওয়ানি কার্যবিধির ৯৬ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণযোগ্য কি না, সে প্রশ্নও আদালতের সামনে উত্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে গুরুত্বারোপ

শিশির মনির বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল দুর্বল হয়ে পড়ে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও ছুটির বিষয়গুলো যদি বিচার বিভাগের পরিবর্তে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে বিচারকরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।

সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগ ‘অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী’ হয়ে উঠতে পারে এমন যুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানে জবাবদিহিহীনতা নয়। বিচারকদের জন্য আচরণবিধি থাকবে, আইন ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নিয়োগ, চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গৃহীত সচিবালয় কাঠামো বাতিল করা ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধান বিচারপতির শুনানি নিয়ে প্রশ্নের জবাব

মামলাটি বিচার বিভাগ-সংশ্লিষ্ট হওয়ায় প্রধান বিচারপতির শুনানিতে অংশগ্রহণ ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি করে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, এটি কোনো ব্যক্তির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, বরং একটি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন।

তিনি উদাহরণ হিসেবে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত বিষয়ে অতীতেও সুপ্রিম কোর্ট নিজেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ফলে এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠে না।

সরকার সবসময় বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করার দায়িত্ব সরকারের। তবে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনে না।

যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলাটি

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশনা চেয়ে ১০ জন আইনজীবীর পক্ষে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি, বদলি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এসব ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল।

রিটের পর হাইকোর্ট পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিলে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ জারি করে। পরবর্তীতে ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।

এই সচিবালয়ের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি এবং নিয়োগসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আসে।

তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

বিলটি নিয়ে সংসদে বিতর্কের সময় বিরোধী সদস্যরা একে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে আরও বিস্তৃত পর্যালোচনা ও পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে।

এখন আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল, কারণ সেই রায়ের ওপরই নির্ভর করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ভবিষ্যৎ।