রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে চিকিৎসককে ঘিরে বিতর্ক, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে অনিয়মের অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জের ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর সঙ্গে অশোভন আচরণ, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে চাপ দেওয়া এবং চিকিৎসাসেবায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সিভিল সার্জন বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, যা বর্তমানে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে, সেখানে কর্মরত চিকিৎসক ডা. আতিকুল বারীর বিরুদ্ধে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা এক রোগীর সঙ্গে অশোভন আচরণ এবং চিকিৎসাসেবায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী প্রতিকার চেয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী জানান, গত ২৭ জুন হঠাৎ কানে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলে তিনি খানপুরের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে যান। বহির্বিভাগ থেকে টিকিট কেটে ডা. আতিকুল বারীর কক্ষে প্রবেশ করলে চিকিৎসক তার সমস্যার কথা শুনে কিছু ওষুধ ও কয়েকটি পরীক্ষা লিখে দেন। পরে চিকিৎসকের নির্দেশে একজন সহযোগী তার হাতে একটি কার্ড দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পরীক্ষা করাতে বলেন।

তিনি হাসপাতাল থেকেই রক্ত পরীক্ষা করান। এরপর চিকিৎসকের নির্দেশিত হিয়ারিং কেয়ার সেন্টারে গেলে সেখানে তাকে জানানো হয়, পরীক্ষার জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা লাগবে। সঙ্গে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় তিনি বাড়ি ফিরে যান। পরে এক নিকটাত্মীয়ের সহায়তায় ফাস্ট কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কানের পরীক্ষা করিয়ে প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন।

ভুক্তভোগীর দাবি, গত ৪ জুলাই সকালে সেই প্রতিবেদন নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে ডা. আতিকুল বারী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, “তোমাকে যেখান থেকে পরীক্ষা করাতে বলেছি, সেখান থেকেই করিয়ে আনো। আমি এই প্রতিবেদন দেখব না। তুমি বের হয়ে যাও।” এরপর তাকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। কানের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে কান্নারত অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার পর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কর্মরত অনেক চিকিৎসক রোগীদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। পাশাপাশি তারা যেসব বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ব্যক্তিগতভাবে রোগী দেখেন, সেখানেও যেতে বলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত পরীক্ষার বিষয়ে হিয়ারিং কেয়ার সেন্টার ও ফাস্ট কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কথা বললে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। একটি প্রতিষ্ঠান জানায়, কানের শব্দ নির্ণয়ের পরীক্ষা করতে হবে। অন্য প্রতিষ্ঠান জানায়, কানের এক্স-রে প্রয়োজন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে ঠিক কোন পরীক্ষা লেখা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এম. এ. আবুল বাসার বলেন, “হাসপাতালে কর্মরত কোনো চিকিৎসকের এমন আচরণ বা কার্যক্রম মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।” এ সময় ভুক্তভোগী তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন।

নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহম্মদ মশিউর রহমান বলেন, “চিকিৎসাসেবা নিতে আসা কোনো রোগীর সঙ্গে অশোভন আচরণ আমাদের কাম্য নয়। কাউকে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করাও উচিত নয়। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে ডা. আতিকুল বারীর বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ডা. আতিকুল বারী ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে যোগদান করেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় তিনি একই স্থানে বহাল রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ তুললেও তা বিভিন্নভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। ফলে তিনি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছামতো দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের মতে, জেলায় দুটি সরকারি হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসাসেবার মান দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। চিকিৎসা একটি মানবিক সেবা হলেও কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এটিকে বাণিজ্যে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ও ক্লিনিক থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তাদের মতে, আগের সরকারের সময় যাদের প্রভাব ছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাদের একটি অংশ এখনো বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে। সেই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই গড়ে ওঠা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ও ক্লিনিকগুলোর পরীক্ষার মান নিয়েও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে।