চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে এবং তার উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, তাদের দল আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা না তুললে সমর্থকেরা ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ‘ঠেকিয়ে’ দেবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ‘সহিংসতায়’ গড়াতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায়ের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে।
৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-সহ মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন এ মামলায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং আদালতের দৃষ্টিতে তিনি পলাতক। সে কারণে মামলার শুনানিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তিনি পাননি। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে মামলাটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন।
জয় সাক্ষাৎকারে জানান, ভারত তার মাকে ‘পুরো নিরাপত্তা’ দিচ্ছে এবং ‘রাষ্ট্রপ্রধানের মতো’ দেখভাল করছে। তিনি বলেন,
“আমরা খুব ভালোভাবেই জানি রায় কী হবে। তারা সরাসরি সম্প্রচার করবে, তাকে দোষী সাব্যস্ত করবে এবং সম্ভবত মৃত্যুদণ্ড দেবে। কিন্তু আমার মায়ের কিছু করতে পারবে না। তিনি ভারতে নিরাপদ।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা অতীতের মতো দিল্লিতে ‘স্বাধীনভাবে’ চলাফেরা করতে পারেন বলে জানালেও নিরাপত্তার কারণে সতর্ক থাকতে হয় বলে মত দিয়েছেন।
১৯৭৫ সালে সেনাসদস্যদের হাতে শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। তখনও দীর্ঘদিন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয় শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে।
সম্প্রতি দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তাকে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করা ‘অবধারিত’, কারণ তার ভাষায় মামলাটি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রহসন’।
জয় জানান, আওয়ামী লীগকে নিয়ে নির্বাচন ছাড়া তারা কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না এবং সেক্ষেত্রে ‘আপিলও করবেন না’। জুলাই হত্যার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির নিবন্ধনও স্থগিত হওয়ায় ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
জয়ের বক্তব্য,
“আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন আমরা হতে দেব না। আমাদের বিক্ষোভ আরও তীব্র হবে। যা দরকার তাই করব আমরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিছু না করলে নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে… সংঘাত হবেই।”
শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি, যানবাহনে আগুন ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে। এসব নাশকতায় জড়িতদের গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার পুলিশ প্রধান। প্রতিদিনই নাশকতার অভিযোগে আওয়ামী লীগ কর্মীদের আটক করা হচ্ছে। রাজধানীতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনা সদস্যদের টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জয় জানান, তিনি ও তার মা দেশে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তবে অন্তর্বর্তী সরকার বা বিএনপির সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তার ভাষায়,
“গত কয়েক দিন দেখছেন—সারা দেশে শাটডাউন, বড় বড় বিক্ষোভ। এগুলো আরও বড় হবে।”
দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃতিত্ব পেলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দমন-পীড়নের অভিযোগে সমালোচিত হন। তার সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে দুটি বর্জন করে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। এ সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হয়েছে।
বর্তমানে সেই পরিস্থিতি উল্টে গেছে বলে মন্তব্য করেন জয়। তিনি বলেন,
“তিনি (শেখ হাসিনা) হতাশ, রাগান্বিত, ক্ষুব্ধ। আর আমরা সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—যে কোনো উপায়ে লড়াই চালিয়ে যাব।”
