চোখের জল, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়

যাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন—সেই অগণিত মানুষের চোখের জল, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় নিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

বুধবার বেলা ৩টা ২ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সব সড়ক ও অলিগলিতে হাজারো মানুষ জানাজায় অংশ নেন। নারীদের অংশগ্রহণের জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থা।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব আবদুল মালেক জানাজা পড়ান। জানাজা সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।


জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। তিনি বলেন,
“আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আজ এখানে উপস্থিত সকল ভাই ও বোনদের কাছে অনুরোধ—মরহুমা জীবিত থাকাকালীন যদি কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, তাহলে দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি ইনশাআল্লাহ তা পরিশোধের ব্যবস্থা করব।

একই সঙ্গে উনার কোনো আচরণ বা কথায় যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন, আল্লাহ তাআলা যেন উনাকে বেহেশত নসিব করেন।”

জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাম পাশে দাঁড়ান তারেক রহমান। তার পরপরই ছিলেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার।

প্রধান উপদেষ্টার ডান পাশে ছিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তার পরে দাঁড়ান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে থাকা সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার ও এম সাখাওয়াত হোসেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকেও জানাজায় দেখা যায়।

বিএনপির পক্ষ থেকে জানাজায় অংশ নেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন কবি ও তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার।

রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর মিয়া গোলাম পরওয়ার ও শামীম সাঈদী, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর। এছাড়া ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহকেও জানাজায় দেখা গেছে।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।

চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রধানরাও নিজ নিজ দেশের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শেষ যাত্রায় অংশ নেন।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং বুধবার সাধারণ ছুটি দেওয়া হয়।

বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে তার কফিন নেওয়া হয় গুলশানে ছেলে তারেক রহমানের বাসভবনে। পরে জাতীয় পতাকা মোড়ানো লাশবাহী গাড়ি বেলা পৌনে ১২টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। একটি বাসে করে সেখানে পৌঁছান তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা।


উল্লেখ্য, এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন তার স্বামী, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

জানাজার পর বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করার কথা রয়েছে।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া খালেদা জিয়া ৪১ বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।