আবু সাঈদ হত্যা মামলা: ৯ এপ্রিল জানা যাবে ট্রাইব্যুনালের রায়

রংপুরে আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আগামী ৯ এপ্রিল ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী এর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ এই তারিখ নির্ধারণ করেন।

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর গত ২৭ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে আন্দোলনের সময় আবু সাঈদ, যিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন, পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ঘটনাস্থলে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করার ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।

পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমনে সরকার কারফিউ জারি করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তুমুল গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

তদন্ত প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে মোট ৩০ জনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। এর মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন এবং বাকি ২৪ জন পলাতক। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পুলিশ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কর্মকর্তা এবং ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন রয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যসহ মোট ২৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আদালতে সিসিটিভি ফুটেজ ও টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারের ভিডিওও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব সাক্ষ্য–প্রমাণের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে আসামিদের আইনজীবীরা মামলার বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, নিহত শিক্ষার্থীর শরীরে গুলির অস্তিত্ব পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি এবং জব্দ করা পোশাকেও গুলির চিহ্ন নেই। ফলে মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এছাড়া অভিযোগপত্রে লাঠিচার্জে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম না থাকা এবং ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনার আইনি ভিত্তি নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

এই মামলার রায় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়—বরং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ ও রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে বড় একটি বিচারিক নজির তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমন অভিযোগ বিচার হওয়ায় এর রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব অনেক বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, রায়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন দায় নির্ধারণ হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে গণআন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক ও নীতিগত আলোচনা তৈরি হতে পারে।

৯ এপ্রিল ঘোষিত এই রায় তাই শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়—বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিচারিক মূল্যায়ন হিসেবেও বিবেচিত হবে।